বাংলাদেশ সোমবার 18, June 2018 - ৪, আষাঢ়, ১৪২৫ বাংলা

বছরজুড়ে বেপরোয়া ঋণ বিতরণ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশিত ২৪ মে, ২০১৮ ১২:২৪:২৮

: টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণ করছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে বেপরোয়াভাবে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুইটি নিয়ন্ত্রণমুলক মুদ্রানীতি দিয়েও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে থামাতে পারছে না। এর ফলে ব্যাংক খাতে এখন ভয়াবহ তারল্য সংকট বিরাজ করছে। আর এই তারল্য সংকট কাটানোর কথা বলে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা এ পর্যন্ত চার ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু তারল্য সংকট কাটছে না। এমন অবস্থায় বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরাও এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ‘অলস’ পড়ে থাকা অর্থ নিতে চাচ্ছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ডজনেরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করেছে। আরও ২২ ব্যাংক আগ্রাসী সীমার কাছাকাছি রয়েছে। ইতোমধ্যে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের দায়ে ওয়ান ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংককে জরিমানা করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ব্যাংককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তদারকি জোরদার করেও আগ্রাসী ব্যাংকিং বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ। পরের মাস জুলাই থেকে শুরু হয় বেপরোয়া ঋণ বিতরণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ২ শতাংশ ঋণ বাড়ানোর সীমা বেধে দিলেও ছয় মাস আগেই অর্থাৎ জুলাই মাসেই ঋণ বাড়ে ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর পর থেকে প্রত্যেক মাসেই ব্যাংকগুলো বেপরোয়াভাবে ঋণ বিতরণ করেছে।

জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর তৈরি পোশাক ছাড়াও বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, ওষুধ শিল্পের সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়েছেন। এসব খাতের মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে ঋণ চাহিদা বেড়েছে। একইসঙ্গে চাল আমদানির সঙ্গে খাদ্যপণ্য গম, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ আমদানিতেও অর্থায়ন করেছে ব্যাংকগুলো।এছাড়া সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র আমদানিতেও ঋণ চাহিদা বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র আমদানিতেও ব্যাংকের টাকা যাচ্ছে।’ তিনি উলে¬খ করেন, ‘ঋণের প্রবৃদ্ধি আরও হওয়া দরকার। কারণ, গত টানা সাড়ে তিন থেকে চার বছর ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা বিরাজ করছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের যেসব সমস্যা রয়েছে, এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা জরুরি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৪ হাজার ৩০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

যদিও আশানুরূপ ঋণ চাহিদা না থাকায় কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের কাছে প্রচুর উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। গত জুনের পর হঠাৎ করে ঋণ চাহিদা বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ঋণ বাড়িয়েছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা কয়েক বছরের সর্বোচ্চ। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেধে দেওয়ার সীমার চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। ঋণের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না- এমন আলোচনার মধ্যে গত ৩ জানুয়ারি ব্যাংকার্স সভায় ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমানোর ইঙ্গিত দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ৩০ জানুয়ারি ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করলেও বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের চাপে সেটি কার্যত পিছিয়ে যায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত।

নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকেরই এডি রেশিও ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ঋণ বিতরণের সময় অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে ঋণ বিতরণের সীমা বেধে দেওয়া হয় ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকগুলো ওই মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঠিক করে দেওয়া সীমার চেয়ে ২ শতাংশ বেশি হারে ঋণ বিতরণ করে। জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এটি আরও বেড়ে হয় ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এই সময়গুলোতে কোনও কোনও ব্যাংক আমানত প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ হারে ঋণ বিতরণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকেই তারল্য বা নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগদ টাকার টানাটানির মধ্যে গত মার্চে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হওয়ার পেছনে তৈরি পোশাক ছাড়াও টেলিকম, জ্বালানি, ওষুধসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। এছাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ শিল্পায়নে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।’ অনেক দিন ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করার ফলে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন


এ সম্পর্কিত খবর

ধামরাইয়ে অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পায়নি

ধামরাইয়ে অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পায়নি

 মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির আলোকে ঢাকার ধামরাইয়ে প্রায় অর্ধশত বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা স্থগিত করা হয়েছে।

বিএনপির ভারত সফর: আ’লীগ নেতাদের ত্রিমুখী বক্তব্য

বিএনপির ভারত সফর: আ’লীগ নেতাদের ত্রিমুখী বক্তব্য

সম্প্রতি বিএনপির তিন নেতার ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এসবের বাইরে নেই সরকারি

ঈদের কথা ভাবার সুযোগ নেই রোহিঙ্গাদের!

ঈদের কথা ভাবার সুযোগ নেই রোহিঙ্গাদের!

 ‘টানা বৃষ্টিতে ভেঙে গেছে একমাত্র সম্বল ঝুপড়ি ঘর। এখন যেখানে রয়েছি সেখানে গত দুই দিন


গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তিতাস

গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তিতাস

ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য গড়ে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস বিরতণ কোম্পানি তিতাস।

পাটুরিয়ায় চাপ বাড়ছে যানবাহনের নৌ পুলিশের পরিদর্শন

পাটুরিয়ায় চাপ বাড়ছে যানবাহনের নৌ পুলিশের পরিদর্শন

 ঈদযাত্রায় মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় যাত্রী যানবাহনের চাপ বাড়ছে। মঙ্গলবার দুপুরে যাত্রীবাহী বাস ও

বিদেশিরা কখনো নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না: তোফায়েল

বিদেশিরা কখনো নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না: তোফায়েল

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বিদেশিরা কখনো কোনো দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ


রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ১০ কোটি টাকার ঈদ উপহার

রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ১০ কোটি টাকার ঈদ উপহার

 মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় লোকদের জন্য ঈদ উপহার পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

বিল না দিলে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়ার নির্দেশ

বিল না দিলে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়ার নির্দেশ

 ‘ডিসকানেক্ট ফর নন পেমেন্ট’ পদ্ধতিতে টাকা না দিলেই বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়ে বকেয়া বিল আদায়ে

খালেদাকে এবার যে কারণে ঈদ কার্ড পাঠাননি প্রধানমন্ত্রী

খালেদাকে এবার যে কারণে ঈদ কার্ড পাঠাননি প্রধানমন্ত্রী

 বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন নববর্ষ ও ঈদসহ অন্যান্য প্রধান উৎসবে কার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ