রিজার্ভ চুরি: ফিলিপাইনে এক মামলার বিচার শেষ, ঢাকার তদন্ত কতদূর?


বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে বিচার শেষে এক ব্যাংক ম্যানেজারকে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। তবে তিন বছর হতে চললেও দেশে এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তও এখনও শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রিজার্ভ চুরির ঘটনাটির সঙ্গে একাধিক দেশের নাগরিক জড়িত। সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করতে সময় লাগছে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয় একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই টাকা স্থানান্তর করে তারা। তবে একটি বার্তায় শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর নামের বানান ভুল হওয়ায় ২০ মিলিয়ন ডলার আটকে যায়। বাকি অর্থ ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের (আরবিসি) জুপিটার স্ট্রিট শাখায় স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে পুরো অর্থ স্থানীয় মুদ্রায় পরিবর্তিত হয়ে চলে যায় তিনটি ক্যাসিনোতে। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে এক ক্যাসিনো মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করে বাংলাদেশ সরকারকে বুঝিয়ে দেয় ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মানি লন্ডারিং আইনে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ।

যোগাযোগ করা হলে অর্গানাইজ ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আপাতত নতুন কোনও আপডেট নেই। আমরা দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, রিজার্ভ চুরির তদন্তে নেমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পারেন, এর সঙ্গে বাংলাদেশসহ ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন ও জাপানের নাগরিকরা জড়িত। তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইন সফরও করেছেন। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা—ইন্টারপোল, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা—এফবিআইয়ের সহযোগিতা নিয়ে তদন্তে অন্তত ২০ জন বিদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

তারা জানান, রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত ২০ জন ফিলিপাইন, হংকং, ম্যাকাও, চায়না, শ্রীলঙ্কা, মিশর, সিঙ্গাপুর ও জাপানের নাগরিক। এদের মধ্যে শালিকা ফাউন্ডেশন নামে শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর ৭ জন পরিচালক রয়েছে। সাসাকি নামে এক জাপানির সম্পৃক্ততাও পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। বেইজিংয়ের শুহুয়া গাও এবং ম্যাকাওয়ের ডিং জিজে ছাড়াও মিশরের এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিরা সবাই ফিলিপাইনের নাগরিক।

বৃহস্পতিবার (১০ জানুয়ারি) ফিলিপাইনের একটি আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সেখানকার আরবিসি ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার দেগুইতোকে ৩২ থেকে ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে তাকে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়। এ মামলায় ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা স্বাক্ষ্য ও ফরেনসিক প্রতিবেদন জমা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শনাক্ত বিদেশি নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে দূতাবাসের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জানাতেও অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে এখনও কোনও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

সিআইডি’র একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি সারা দুনিয়ায় আলোচিত একটি বিষয়। এর তদন্ত করতে হচ্ছে সূক্ষ্মভাবে। যেহেতু ঘটনাটির সঙ্গে আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্র জড়িত, তাই তদন্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। তাদের কার্যকর সাড়া না পেলে পুরো তদন্ত শেষ করতে একটু সময় লাগবেই।’

সূত্র জানায়, পুরো কাজটি আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্র এমনভাবে করেছে যে বাংলাদেশের কেউ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে— এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ তারা হাতে পাননি। তবে রিজার্ভ চুরির সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল কিনা, তাও খুঁজে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের কেউ সরাসরি জড়িত না হয়ে পরোক্ষভাবেও অপরাধী চক্রের সঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে। পুরো বিষয়টি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মামলা দায়ের করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। এ দলে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান। গত ৮ জানুয়ারি রাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করার কথা। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল’ ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের  কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি