ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা : কৃষিখাতে সরকারের দেয়া ভর্তুকির টাকা পেতে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন কৃষক আবু সিদ্দিক খন্দকার। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সরাইল শাখায় খোলা এই অ্যাকউন্ট দিয়ে কেবল একবারই লেনদেন করেছেন তিনি। এরপর থেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে তার অ্যাকাউন্টটি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে তার সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি। অ্যাকাউন্টটি দিয়ে কী ধরনের লেনদেন করা যায় সেটিও জানেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের সৈয়দটুলা গ্রামের এই কৃষক।

আরো পড়ুন : পুলিশকে চড় মারার দায়ে সেই নারী কাউন্সিলর কারাগারে

অজ্ঞতার পাশাপাশি কৃষিখাতে ভর্তুকির টাকার বদলে এখন কৃষকদের ফসল উৎপাদনে প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেয়ায় এই অ্যাকাউন্টে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। আর যেসব কৃষকরা টুকিটাকি লেনদেন করছেন সেটিও সরকারের কাছে বিক্রি করা ধানের টাকা উত্তোলন করার জন্য।

যদিও কৃষকের এই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয় কৃষকদের। এর পাশাপাশি ডিপোজিট স্কিমে সাধারণ গ্রাহকদের তুলনায় দেয়া হয় বেশি মুনাফা। তবুও এই অ্যাকাউন্টে লেনদেনে খুব একটা উৎসাহী নন কৃষকরা। ফলে অধিকাংশ কৃষকের অ্যাকাউন্টই কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কৃষি কার্ড এবং কৃষি অফিসারের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে ব্যাংক থেকে ১০ টাকার ফরম পূরণ করেই অ্যাকাউন্ট করতে পারেন কৃষকরা। মূলত কৃষিখাতে সরকারের দেয়া ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের কাছে দেয়ার জন্য কৃষকের সুবিধার্থে ১০ টাকায় কৃষি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়া হয়। সরকার যখন ঘোষণা দেয়, তখনই কৃষকদের ভর্তুকির টাকা দেয়া হয়। তবে কেবল ভর্তুকির টাকা উত্তোলনের জন্যই নয়, এই অ্যাকাউন্ট দিয়ে কৃষকরা অন্যসব লেনদেনও করতে পারবেন।

আরো পড়ুন : গাজীপুরে খেলতে গিয়ে সেপটিক ট্যাংকে পড়ে ২ শিশুর মৃত্যু

অবশ্য এখন আর কৃষকদের নগদ টাকা দেয়া হয় না। প্রতিবছর ফসল উৎপাদনে টাকার বদলে প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেয়া হচ্ছে। যাদের কৃষি কার্ড আছে তাদেরকেই কেবল কৃষি প্রণোদনা দেয়া হয় এখন।

ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকলেও লেনদন করেন না সরাইল উপজেলার এমন একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। লেনদেন না করার কারণ হিসেবে নিজেদের অজ্ঞতার কথাই জানিয়েছেন তারা।

কৃষক আবু সিদ্দিক খন্দকার জানান, স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়েই তার সংসার। আর জীবিকার একমাত্র উৎস কৃষিকাজ। দেড়শ শতাংশ কৃষিজমিতে প্রতিবছর তিন জাতের ধান চাষ করেন তিনি। সুবিধা পাবেন জেনে ২০১০ সালে কৃষি ব্যাংকের সরাইল শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে ১০ টাকা দিয়ে কৃষকের অ্যাকাউন্ট খোলেন তিনি। ওই বছরের ১০ মার্চ সরকারের দেয়া ভর্তুকির ৮শ’ টাকা উত্তোলন করেন অ্যাকাউন্ট থেকে। এরপর থেকে আর এই অ্যাকাউন্টে কোনো লেনদেন করেননি তিনি। কৃষি কার্ড না থাকায় সরকারের কাছেও ধান বিক্রি করতে পারেন না। এর ফলে অ্যাকাউন্টের কোনো প্রয়োজনও পড়ে না।

তিনি আরও জানান, প্রতি মাসে কৃষি ব্যাংকের সরাইল শাখায় বাড়ির বিদ্যুৎ বিল দিয়ে আসছেন তিনি। কিন্তু কখনোই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে কিছু বলেননি। কেন অ্যাকাউন্টে লেনদেন করেন না সেটিও জানতে চাওয়া হয় না তার কাছে। ফলে এই অ্যাকাউন্ট দিয়ে কী ধরনের লেনদেন করা যায় সেটিও জানেন না তিনি।

একই উপজেলার হাফিজটুলা গ্রামের কৃষক মিন্টু মিয়াও একই কথা বলেছেন। তারও কৃষি ব্যাংকের সরাইল শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। কিন্তু একবার লেনদেন করার পর আর কোনো লেনদেই করেননি তিনি। অ্যাকাউন্ট নম্বরও মনে নেই তার। কারণ অ্যাকাউন্টের বিপরীতে তাকে চেকবই বা কোনো কাগজপত্র দেয়া হয়নি।

বাংলদেশ কৃষি ব্যাংকের সরাইল শাখায় সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি কৃষকের অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে এর মধ্যে অধিকাংশ অ্যাকাউন্টেই কোনো লেনদেন হয় না। কেবল সরকারি অনুদান আসলেই অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেন হয়। তবে সাধারণ লেনদেন হয় না কোনোটিতেই।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সরাইল শাখার ব্যবস্থাপক রিপন চন্দ্র দেব বলেন, আমরা যখন গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০-১২ শতাংশ হারে আমানত গ্রহণ করেছি তখনও আমরা ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের ৯ শতাংশ হারে ঋণ দিয়েছি। কৃষকদের জন্য ডিপোজিট স্কিমে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেয়া হয়। আর সাধারণ গ্রাহকদের দেয়া হয় ৩ শতাংশ হারে। কৃষকরা ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট দিয়ে সব ধরনের লেনদেনই করতে পারবেন। আমাদের এখানে যার কৃষি অ্যাকাউন্ট আছে তার অন্য বেসরকারি ব্যাংকেও অ্যাকাউন্ট আছে। লেনদন ওই বেসরকারি ব্যাংকেই করে। তবে এখন নতুন যারা অ্যাকাউন্ট করছেন তাদের সবাইকেই আমরা বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপ-পরিচালক মো. রবিউল হক মজুমদার বলেন, একজন ব্যক্তি যদি অ্যাকাউন্ট করে তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত। কৃষকের এই অ্যাকাউন্টে সাধারণ লেনদেনও সম্ভব। এখন কেউ হয়তো চালাচ্ছে, কেউ চালাচ্ছে না। এটার কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।