কানাডার টরন্টো মসজিদের ইমাম ও খতিব ড. ওয়েল শিহাব। কোভিড-১৯ খ্যাত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মুসলিম সম্প্রদায়ের আচরণ ও করণীয় কেমন হবে সে বিষয়ে ইসলামিক উপদেশ এবং কিছু পরামর্শ দিয়েছেন এ ইমাম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২০ সালের ১১ মার্চ করোনাভাইরাসকে মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কোভিড-১৯ নিয়ে বিশ্বের সব মানুষ চিন্তিত।

কানাডারা মুসলিম সম্প্রদায়কে সব স্থানে যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে সবার অংশগ্রহণে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কার্যকরী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে এগিয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, আমি কিছু মতামত ও পরামর্শ দিতে চাই। তবে অবশ্যই সেটি পেশাদার চিকিৎসাসেবা কিংবা চিকিৎসা পরামর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়। করোনা মোকাবিলা ইমাম ড. ওয়ালি শিহাবের পরামর্শগুলো তুলে ধরা হলো-

>> প্রার্থনা করা
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের উচিত, মহান আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। কেননা আল্লাহর তাআলা এক নাম আশ-শাফি। যার অর্থ হলো ‘নিরাময়কারী’। কুরআনে এসেছে- وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
অর্থাৎ যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই (আল্লাহ) আরোগ্য দান করেন। (শুরা শুআরা : আয়াত ৮০)

অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থদের জন্য সুস্থতার একটি সুন্দর দোয়া শিখিয়েছেন। আর তা হলো-
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ اَذْهِبَ الْبَاسِ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لاَ شِفَاءَ إِلاَّ شِفَاؤُكَ شِفَاءً لاَ يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাসি, আজহিবাল বাসি, ওয়া ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা। শিফায়ান লা ইয়ুগাদিরু সাক্বামা।’ (বুখারি, মুসলিম)

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি মানুষের রব, রোগ নিরাময়কারী। (আপনি) আরোগ্য দান করুন, আপনি আরোগ্য দানকারী। আপনি ছাড়া আর কেউ আরোগ্য দানকারী নেই। এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।’

সব সময় সার্বিক সুস্থতা ও ক্ষতি থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে বিশ্বনবির শেখানোর দোয়া করতে পারি। যে দোয়াটি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়ার কথা বলেছেন তিনি। তাহলো-

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ : ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়ালা ফিসসামায়ি, ওয়া হুয়াসসাম উল আলিম।’(তিরমিজি, আবু দাউদ)

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের এ প্রাদুর্ভাবের সময় কোনো মুমিন মুসলমানের হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং নিজেদের গোনাহের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছেন। দয়া ও ক্ষমার কথা তুলে ধরে তার রহমত থেকে হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
(হে রাসুল! আপনি) বলে দিন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার : আয়াত ৫৩)

প্রতিরোধ ও সতর্কতা
যে কোনো রোগের ক্ষেত্রেই ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’। সে আলোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরামর্শ ও সেবা অনুসরণ করা জরুরি। আবার কুরআনের দিক নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর উপদেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনায় রয়েছে করোনাসহ যাবতীয় মহামারি থেকে বাঁচার উপায়। সে আলোকে কিছু দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন কানাডার টরন্টো মসজিদের ইমাম ও খতিব ড. ওয়ালি শিহাব।

>> পানি এবং সাবানের সাহায্যে ১৫-২০ সেকেন্ড উভয় হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেয়া। যদি পানি কিংবা সাবান পাওয়া না যায় তবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার জীবাণুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করা। ওজুর সময় প্রথমেই উভয় হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেয়া।
>> উভয় হাত ভালোভাবে না ধুয়ে চোখ, নাক কিংবা মুখের কোনো অংশ স্পর্শ না করা।
>> অসুস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বা বেশি সংস্পর্শে না থাকা।

>> অসুস্থতা এড়িয়ে চলতে বাড়ি অবস্থান করা। বিনা প্রয়োজনে বাইরে বেশি বের না হওয়া।
>> অসুস্থ হলে বাড়ি অবস্থান করে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবা গ্রহণ করা।
>> যদি কারো হালকা ঠান্ডা সর্দির মতো কোনো উপসর্গ দেখা দেয় তবে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করা জরুরি। এমনকি শুক্রবারের জুমআসহ নামাজের জামাআতেও অংশগ্রহণ না করা। সংক্রামক রোগের কারণে কেউ নামাজের জামাআতে অংশগ্রহণ করতে না পারলে আল্লাহ তাআলাই তার সে অপারগতা বিশেষ বিবেচনা করবেন।

>> হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে নেয়া। কাশি বা শ্লেষ্মাগুলো টিস্যু দিয়ে আবৃত করে ঢাকনাবিশিষ্ট ময়লার ঝুঁড়িতে ফেলা। অতপর সাবান ও পানি কিংবা জীবাণুনাশক দিয়ে উভয় হাত ধুয়ে নেয়া।
>> কোলাকুলি কিংবা হ্যান্ডশ্যাক থেকে বিরত থাকা। শুধু সালাম ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে পরস্পরের ভাববিনিময় সম্পন্ন করা।
>> ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত নামাজ আদায় করা। মসজিদে আসলে মুখোশ ও হেডমেড ব্যবহার করা।

>> উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্ত তথা ডায়াবেটিস, হৃদরোগেসহ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংক্রামক রোগ থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। সে কারণে তাদের উচিত বেশি মানুষের সমাগম তথা মসজিদ মার্কেট, জনসভাসহ অনুষ্ঠান বা সমাবেশস্থলে না যাওয়া।
>> যারা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ কিংবা কোনো আশঙ্কা করেন তবে দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো জরুরি।
>> ঘরবাড়ি, আঙিনা, রাস্তাঘাট বা লোক-সমাগমের স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।

আল্লাহর ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস
সর্বোপরি মহান আল্লাহর ওপর অগাধ আস্থা এবং বিশ্বাস স্থাপন করে কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলা উচিত। রোগ ব্যাধিতে যেসব দিকনির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম।

মুমিন মুসলমানের জন্য চিকিৎসা ও সেবা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও তার ওপর ভরসা করা জরুরি। আল্লাহ তাআলাই সব কাজ নির্বাহ করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
(হে রাসুল!) আপনি বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন; তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহর ওপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।’ (সুরা তাওবা : আয়াত ৫১)

আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও দয়ার ওপর অগাধ আস্থা এবং বিশ্বাসই মানুষকে মহামারি করোনাসহ দুনিয়ার যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি করোনাসহ যাবতীয় মহামারি প্রতিরোধে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।