গত চার দিন ধরে সর্দি-জ্বর এবং গলা ব্যথা হাসানের। চিকিৎসা নিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে তাকে। লক্ষণ-উপসর্গ শুনেই সেখান থেকে তাকে করোনা টেস্ট করার জন্য বলা হয়। এরপর ঢাকার মিরপুর থেকে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ( আইইডিসিআর) আসেন ২১ বছরের হাসান। কিন্তু এখানে এসেও তিনি পরীক্ষা করাতে পারছেন না। বলা হচ্ছে, হটলাইনে যোগাযোগ করতে, কিন্তু অনেকবার চেষ্টা করেও হটলাইন কথা বলার সুযোগ পাননি হাসান।

আরো পড়ুন : ওমরাহযাত্রীসহ আটকেপড়া ৪০৬ জনকে নিয়ে ঢাকায় নামলো ফ্লাইট

আইইডিসিআরের সামনে প্রতিদিন হাসানের মতো অসংখ্য মানুষ আসছেন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে। কিন্তু সেখানে এখন আর সরাসরি এসে পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। এদিকে ঢাকার একাধিক হাসপাতাল থেকে জ্বর-সর্দি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে। আর আইইডিসিআর বিদেশ ফেরত অথবা বিদেশ থেকে আসা রোগীদের সংস্পর্শে না আসা কারও পরীক্ষাও করাচ্ছে না।

দক্ষিণ বনশ্রীর ৪৮ বছরের শওকত আরা গত শনিবার থেকে ভুগছিলেন পিঠ ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং জ্বরে। মেয়ে সানজিদা শওকত জানান, গত সোমবার মাকে নিয়ে তিনি প্রথমে স্কয়ার হাসপাতালে যান। সেখানে যাওয়ার পর শ্বাসকষ্ট সমস্যা হওয়ার কথা শুনে রক্ত নিলো। কিন্তু  এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া চারটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে।

আরো পড়ুন : জাতির সেবায় চিকিৎসকদের প্রতি আল্লামা শফীর আহ্বান

সানজিদা বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা এই রোগী রাখতে পারবে না। সরকার থেকে বলা আছে। তারা রক্তপরীক্ষা এবং এক্সরে রিপোর্ট নিয়ে বাসায় বা কুর্মিটোলা কিংবা মহানগর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছে। আমি ওষুধ দিতে বললেও সেটা তারা দেননি, যদিও তারা নিউমোনিয়া হয়েছে বলে ধারণা করেছেন। এরপর আইইডিসিআরে হটলাইনে কল করেও আমরা পাইনি। কুর্মিটোলার জন্য বের হয়ে সেখানে পরিচিত চিকিৎসকের মাধ্যমে জানতে পারি, সেখানে সরাসরি রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না। আইইডিসিআরে পরীক্ষা করার তাদের পরামর্শ ছাড়া ভর্তি নেবে না।’ তখন মাকে নিয়ে আইইডিসিআরে আসেন সানজিদা। কিন্তু তারা কোনওভাবেই স্যাম্পল কালেক্ট করবে না, কোনভাবেই সেখানে কিছু করা যায়নি—বলেন সানজিদা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক ( মেডিসিন) ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন বলেন, রোগী এসেছিল, কিন্তু সন্দেহজনক হওয়াতে তাকে আইইডিসিআরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সর্দি, কাশি, জ্বরে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের হাসপাতাল ভর্তি নিচ্ছে না। বিদেশ ফেরত বা বিদেশ ফেরত কারও সংস্পর্শে না এলে আইইডিসিআরও পরীক্ষা করছে না। তাহলে এই রোগীরা কোথায় যাবেন—জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আইইডিসিআর যেসব প্রেস রিলিজ বা সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছে তাতে করে সাধারণ মানুষ এবং হাসপাতালগুলোতে কনফিউশন তৈরি হয়েছে। এখন তারা কী করে এর সমাধান করবে তারাই করুক।’ তিনি বলেন, ‘এখন এসব রোগীদের হাসপাতালগুলো সেবা দিচ্ছে না। আবার আইইডিসিআরের হটলাইনে সহজে সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। সরাসরি গেলেও পরীক্ষা করছে না। তাহলে  এ সমস্যার সমাধান কী? তারা যেহেতু সমস্যা তৈরি করেছে, এর সমাধানও তাদেরকেই করতে হবে।’

হাসপাতালগুলো রোগীদের এভাবে নিজ নিজ বাড়িতে পাঠাতে পারে কিনা প্রশ্নে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে  আমরা নিজেরাও এই ধরনের তথ্য পাচ্ছি। দেখতেও পাচ্ছি যে, বিষয়গুলো ঘটছে। এগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। সমস্যাগুলো সমাধানের  জন্য আমাদের দিক থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ( হাসপাতাল) বিষয়টি বিশেষভাবে দেখছেন।’

প্রতিটি হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে, আমাদের উচ্চ পর্যায়ের সবাই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কীভাবে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন করা যায়, সে নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ হচ্ছে, কাজ হচ্ছে। ’

চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতি থাকতে পারে মন্তব্য করে ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘চিকিৎসকদের উৎসাহিত করার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা হচ্ছে। তবে যেহেতু সেগুলো এখনও ফাইনাল হয়নি, যখনই সেসব পরিকল্পনা ফাইনাল হয়ে যাবে তখন জানাবো।’