‘ডিপ্রেশ’  শব্দটির মানে দাঁড়ায় বিষণ্ণতা বা মনমরা। বিষণ্ণতা একটি ইমোশনাল ইলনেস এবং এর ফলে রোগীর মন মেজাজের অবনতি ঘটে। মানসিক রোগের মধ্যে সর্বাধিক কমন রোগ বিষণ্ণতা। এটি এমন এক রোগ যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে উদ্বিগ্নতা। বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে বিভিন্ন মাত্রায়, গভীরতায় ও পরিসরে। বেশিরভাগ সময়ে এটি দীর্ঘমেয়াদী হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন অর্থহীন এবং দুর্বিষহ করে তুলে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভেঙ্গে পড়েন খুব সহজে এবং অলস, অকর্মঠ, শক্তিহীন ও নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

আর তাই আমাদের সবার দায়িত্ব হলো নিজের মা-বোন-মেয়ে-বন্ধুদের প্রতি নজর রাখা, কারণ তখন আর তারা বিষণ্নতায় ভুগবেন না। বিষণ্নতাকে বর্তমানে স্ট্রোক ও হূদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত মনে করছেন গবেষকরা। তবে গবেষকরা একথা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, এন্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধগুলো স্ট্রোকের জন্য দায়ী নয়, যারা এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করেন তাদের স্ট্রোকের সম্ভাবনা ৩৯ শতাংশ বেশি থাকার কারণই হচ্ছে তাদের প্রচণ্ড রকম বিষণ্নতা যার জন্য তাদেরকে ওষুধের সাহায্য নিতে হয়।

স্ট্রোক: জার্নাল অফ আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে ৫৪ থেকে ৭৯ বছর বয়সের ৮০ হাজার ৫৭৪ জন নারীর ওপর এ গবেষণা  চালিয়ে  তথ্য পাওয়া গেছে এবং উচ্চরক্তচাপ, বহুমূত্র, হূদরোগ, ধূমপানের সঙ্গে সঙ্গে বিষণ্নতাকেও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে কারণ বহুদিন ধরেই গবেষকরা বিষণ্নতার সঙ্গে স্ট্রোক ও হূদরোগের সম্পর্ক আছে বলে অনুমান করছিলেন, আর এই গবেষণার মাধ্যমে সে অনুমানের সপক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেল।পরিবারের বা কাছের মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত গুরুত্ব ও আচরণ না পাওয়া, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি, মনের কথা বলতে পারার মতো পরিস্থিতি না থাকা, ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা কর্মজীবনে ব্যর্থতা, আর্থিক সমস্যা, স্বপ্নপূরণের পথে বাধা ইত্যাদি নানা কারণে নারী হয়ে যেতে পারে বিষণ্ন।

করণীয়

তিনি কি ভাবছেন, তার মনে কোনো দুঃখবোধ, দুশ্চিন্তা, ভীতি, না-বলা-কথা আছে কি না এ ব্যাপারে অবগত থাকেন, বন্ধুর মতো সহজিয়া আচরণ করেন এবং তার পাশে থাকেন তাহলে বিষণ্নতা না পালিয়ে পথ পাবে না। তাই আজই খোঁজ নিন আপনার প্রিয় মানুষের, তার পাশে বসে গল্প করুন, তার চিন্তা-ভাবনা ও স্বপ্ন-কল্পনা, চাওয়া-পাওয়া-প্রত্যাশা সম্পর্কে জানুন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করুন।

পছন্দের কাজে উৎসাহিত করুন

সবকিছুতেই অনাগ্রহ বিষণ্ণতা আক্রান্ত রোগের আরেকটি লক্ষণ। রোগীর আগ্রহের বিষয়ের প্রতিও তখন অনাগ্রহ তৈরি হয়। সে শখের কাজগুলিতেও ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কোন কাজেই উৎসাহ থাকে না। সারাদিন শুয়ে বসে থাকাকেই মনে হয় সব থেকে সহজ কাজ এবং এর বাইরের সকল কাজকেই বোঝা মনে হবে। একসময় যে কাজে রোগী খুব আনন্দ পেতেন, ডিপ্রেসশড হয়ে যাবার পর সে কাজে কোন আগ্রহই পাবে না। তাই তিনি আগে যে কাজটি করতে পছন্দ করতেন তাকে আবার সেসব কাজ করার জন্য উৎসাহিত করুন। তিনি যেসব জায়গায় যেতে পছন্দ করতেন, সেখানে সব বন্ধুরা মিলে পিকনিকের আয়োজন করতে পারেন। অথবা তিনি যদি গান গাইতে পছন্দ করেন তাহলে সবাই মিলে গানের আসরের আয়োজনও করতে পারেন।

হয়ে উঠুন একজন ভালো শ্রোতা

 বিষণ্ণতাক্রান্ত ব্যক্তি নিজের মধ্যে অনেক কষ্ট, দুঃখ এবং আবেগ লুকিয়ে রাখেন, কারো কাছে তা প্রকাশ করেন না। আবার মাঝে মাঝে তারা মন প্রাণ দিয়ে চান কেউ তাদের কথা শুনুক, কিন্তু কার সাথে তাদের মনের কথা শেয়ার করবেন তা বুঝে উঠতে পারেন না। তাই বন্ধু হিসেবে আপনার উচিত তাকে আশ্বস্ত করা যে, তার মনের সকল কথা আপনার সাথে তিনি নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারবেন। তার মনের সকল অব্যক্ত অনুভূতি ও কথা প্রকাশ করতে দিন। আপনি শুধু তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে যান। তাকে অযথা উপদেশ এবং পরামর্শ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। তবে তিনি যদি আপনার কাছে কোনো বিষয়ে পরামর্শ চান, সেক্ষেত্রে আপনি তাকে সুপরামর্শ দিতে পারেন।

হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন

বিষণ্ণতাক্রান্ত বন্ধুকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন। কারণ হাসি বিষণ্ণতা কমায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, হাসি বিষণ্ণতা কমানোর ঔষধ হিসাবে কাজ করে। যারা বেশি হাসেন তাদের বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা কম। আর যারা রসিকতাকে জীবনের সাথে জড়িয়ে ফেলেছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ইতিবাচক যা তাদের বিষণ্ণতার হাত থেকে রক্ষা করে। তাই আপনার বন্ধুকে যদি সুস্থ করে তুলতে চান, তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন। সব বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিন, প্রকৃতির সংস্পর্শে কোথাও ঘুরতে যান, দূরে কোন গ্রামে ঘুরে আসুন। সেইসাথে তাকে হাসিখুশি রাখার জন্য মজার মজার জোকস ও গল্প শুনাতে পারেন কিংবা রম্য গল্পের বইও উপহার দিতে পারেন।

পাশে থাকুন

বিষণ্ণতাক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় একাকীত্বে ভোগেন। তাই যতটা সম্ভব তাকে সময় দেয়ার চেষ্টা করুন। একসাথে কোনো জিমে ভর্তি হয়ে যেতে পারেন কারণ যেকোনো ধরণের শারীরিক সক্রিয়তা এক ধরণের হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে যা বিষণ্ণতা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আস্তে সহায়তা করবে।এছাড়াও তার সাথে লাইব্রেরি বা পাঠাগারে গিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন অথবা বাসার পাশের পার্কে কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করুন। আপনাকে পাশে পেয়ে আপনার বন্ধুর একাকীত্ব কিছুটা হলেও দূর হবে এবং একঘেয়েমিও কাটবে। শরীর ও মন ঝরঝরে আর স্বতঃস্ফূর্ত হবে।

জীবন অনেক মূল্যবান। কিন্তু বিষণ্ণতার কারণে আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের  প্রিয়জনকে. এই মরণ ফাঁদ থেকে আপনজনদের রক্ষা করতে আমাদের উচিত সচেতন হওয়া, একে অন্যকে সময় দেওয়া, যথাসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।