ব্যায়াম বা শারীরিক কসরত করা মানবদেহের জন্য অনেক উপকারী। এর ফলে শরীরের বাড়তি মেদ কাটে, কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে, শারীরিক সক্ষমতা ও শক্তি বাড়ে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মন প্রফুল্ল থাকে।

ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। তিনটি বিশেষ কারণে ব্যায়াম অতীব জরুরি। এক- অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয় করা; দুই- শরীরের গঠন-গড়ন সচল রাখা; তিন- শিথিলায়ন ও মানসিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি।

বিভিন্ন উপায়ে এরূপ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন হতে পারে। যেমন ব্যায়ামাগার বা জিমে গিয়ে, মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে, সাঁতার কেটে, যোগাসন করে, শারীরিক পরিশ্রম করে এবং এরূপ বা অনুরূপ যেকোনো পদ্ধতিতে। তবে ক্যালরি ক্ষয় এবং শারীরিক সচলতা চাই-ই চাই! সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু লাভের মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে এর কোনোই বিকল্প নেই। এমনকি বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি। তবে উপরোক্ত কঠিন পদ্ধতিতে নয়; হাঁটাচলা, যোগাসন, আকুপ্রেশার বা অন্যকোনো থেরাপিউটিক পদ্ধতিতে।

নিয়মিত ব্যায়াম অনুশীলনের ফলে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক সচেতনতা, রোগ নিরাময়, রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও আরো কত বিষয়ে যে উপকারলাভ করা যায়, তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি নিয়মিত ব্যায়াম করলে ক্যানসারের মৃত্যুর ঝুঁকি কমার পাশাপাশি এর চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হ্রাস পায়।

তাছাড়া ব্যায়ামের সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অটিজম দূর হওয়ার সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছেন নেদারল্যান্ডসের একদল বিজ্ঞানী। তারা বলছেন অটিজম বা লার্নিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুর সমস্যা দূর করতে ঘাম ঝরানো ব্যায়াম হতে পারে একটি চিকিৎসা। একইসঙ্গে নিবিড় ব্যায়াম শিশু থেকে শুরু করে ৩৫ বছরের যুবক পর্যন্ত যেকোনো মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বাড়ায়।

ব্যায়াম অনুশীলন না করার ফলে কেউ মুটিয়ে যায়, অল্প বয়সেই রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে মনের বার্ধক্যে উপনীত হয়। অন্যদিকে ঐ একই বয়সি মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করে স্মার্ট, চৌকস, সুঠামদেহী ও চিরসবুজ জীবনযাপন করতে থাকে। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত যোগাসন ও ব্যায়াম অনুশীলনের মাধ্যমে অনেকে সুস্থ ও আনন্দঘন জীবনযাপনই শুধু করে না, বহুক্ষেত্রে সাফল্যও ছিনিয়ে আনে; যা ঘটে থাকে খেলোয়াড় ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জীবনে।

ব্যায়ামের ফলে শরীর থেকে প্রচুর গ্লুকোজ ও তরল বের হয়ে যায়। তাই ব্যায়ামের পর এমন খাবার খাওয়া উচিত, যা ধীরে ধীরে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু যদি এমন খাবার খাওয়া হয়, যা শরীরে কেবল চর্বি ও লবণ বাড়াবে, তাহলে তা শরীরকে গ্লুকোজ আর পানি গ্রহণে বাধা দেবে; এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ব্যায়ামের পরপরই চর্বি ও লবণযুক্ত যেসব খাবার খাওয়া উচিত নয় তা হলো পনির, প্রক্রিয়াজাত মাংস, বেকন, সালামি, সসেজ, সেরিয়ালস, রুটি, ফলের রস, ডিমভাজি, মিল্কশেক, কাঁচা সব্জি ইত্যাদি।

নিজ বাগানে ব্যায়ামের মাধ্যমে নিশ্চিত সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুলাভ আপনার বাড়ির আঙিনায় বা আশপাশে একটি বাগান তৈরি করে তার পরিচর্যা নিজ হাতে রাখলেই আপনি স্বাস্থ্যের দিক থেকে ভীষণ সমৃদ্ধ ও সুখী মানুষ বনে যেতে পারেন সহজে। কারণ এই একটি বাগান আপনাকে যেমন সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক চর্চায় নিয়োজিত করে রাখবে; তেমনি মানসিক চাপ, অবসাদ ও হতাশা দূর করে আপনাকে কর্মক্ষম, কর্মদ্যোগী, সুস্থ-সবল ও দীর্ঘায়ুর নিশ্চয়তা দেবে।

ঔষধ হিসেবে ভাবলে ব্যায়ামের নিরাময় ক্ষমতা বিস্ময়কর। নিয়মিত ব্যায়াম ও নড়াচড়ায় ঠান্ডা-সর্দির মাত্রা কমে যায় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এর পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে ২৭ শতাংশ, ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমে ৫০ শতাংশ, উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি কমে প্রায় ৪০ শতাংশ, ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় ৫০ শতাংশ, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ৬০ শতাংশেরও বেশি, আলঝেইমারস হওয়ার ঝুঁকি কমায় ৪০ শতাংশ; বিষণœতা কমায় ঠিক যেমন কমে ঔষধ বা বিভিন্ন থেরাপি নিলে।

গবেষকরা দেখেছেন যারা প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট ব্যায়াম করে, তাদের হৃদরাগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যারা ব্যায়াম একেবারেই করে না, তাদের চেয়ে ১৪ শতাংশ কম। গবেষকরা বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী প্রত্যেকের উচিত নিয়মিত শরীরচর্চা করা। এতে শরীর সুস্থ থাকার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও কমবে।

নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, খেলাধুলা করা উত্তম ব্যায়ম। পাশাপাশি ইয়োগা বা যোগব্যায়ামও উত্তম ব্যায়াম হিসেবে বেশি পরিচিত। ইয়োগা বা যোগব্যায়াম শারীর-বিজ্ঞানের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দেহকে নীরোগ, সুস্থ, সবল ও কর্মঠ রাখতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

যোগব্যায়ামে দেহ নমনীয় ও কমনীয় হয় এবং দেহের ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধি পায়। কিছু কিছু যোগব্যায়াম আছে, যেগুলো যেকোনো পরিবেশে এবং যেকোনো সময়ে করা যায়।

নিয়মিত শরীরচর্চা অভ্যাসে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতো শক্তিশালী হয়ে উঠে যে রোগ-জীবাণু দেহে প্রবেশ করলেও ইয়োগা চর্চাকারীকে সহজে কাবু করতে পারে না। ফলে দেহ সহজে আক্রান্ত হয না। তারপরও অধিকতর নিরাপত্তার কারণে দেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশের উপায়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিৎ।