স্মৃতি শক্তি আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজন তা বলার অবকাশ থাকে না । ভুলে যাওয়া খুবই সাধারণ প্রক্রিয়া। সময়ের সাথে সাথে মানুষের স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়। তবে সময়ের এই প্রভাবকে একটু দীর্ঘায়িত করা যায়। হার্ট, ফুসফুস, পেশির যত্নের সাথে সাথে সুস্থ থাকতে হলে খেয়াল রাখতে হবে আপনার মস্তিষ্কের দিকেও।বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে । আবার দেখা যায় অনেক বাচ্চারও স্মৃতি সমস্যা দেখা যায় ।

আপনি যেকোনো তথ্য মনে রাখতে চাইলে সেটি অন্যের সাথে শেয়ার করুন। ছোট এই কৌশলটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যেকোনো তথ্য।

স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে যা যা করবেন-

১. গ্রুপিং এবং সম্পর্কযুক্ত শব্দ: আপনি যখনই নতুন কোনো কিছুর সাথে পরিচিত হবেন বা নতুন কোনো কিছু শিখবেন সেই সম্পর্কযুক্ত আরেকটি শব্দ খুঁজে বের করুন। যেই শব্দটির সাথে আপনি পূর্বেই পরিচিত। যেমন নতুন কোনো মানুষের সাথে পরিচিত হলে তার নাম মনে রাখার জন্য সেই নামের সাথে মিল এমন কোনো পরিচিত মানুষের কথা মনে করুন। দেখবেন ভবিষ্যৎ তার নাম ভুলে যাচ্ছেন না। ফোন নাম্বার মনে রাখার জন্য বড় নাম্বারটি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মনে রাখুন, যেমন ১১ সংখ্যার কোনো নম্বরকে ৩ সংখ্যা ৩ সংখ্যা করে মনে রাখুন।

২. স্বাস্থ্যকর খাবার: আমরা সবাই জানি ফল, শাকসবজি, মাছ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ফল, শাকসবজির সাথে ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ খাবার, বাদাম, বিনস, পালং শাক, মিষ্টি কুমড়োর বীচি, সামুদ্রিক মাছ, রঙিন ফল, গ্রীণ টি ইত্যাদি খাবার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

৩. ঘুম: ঘুমকে আমরা অনেকেই গুরুত্ব দেই না। কিন্তু শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখতে ঘুমের ভূমিকা অপরিসীম। ঘুম মস্তিষ্কের অন্যতম ডিটক্সিফাইন কর্ম। ঘুমের সময় আমাদের শরীরে কোষের পূর্ণবিন্যাস করে এবং বিষাক্ত পদার্থ দূর করে থাকে। চেষ্টা করুন রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ঘুমাতে যাবার। মধ্যরাত ঘুমের জন্য সবচেয়ে ভাল সময়।

৪. মেডিটেশন: স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে মেডিটেশন অন্যতম একটি মাধ্যম। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালফোনিয়ার গবেষকরা ৪৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণা করে দেখেছেন যে মেডিটেশন মস্তিষ্কের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে। তারা শিক্ষার্থীদেরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখেছেন, এর মধ্যে এক ভাগ পুষ্টি বিষয়ক ক্লাস করেছেন, আরেক ভাগ মেডিটেশন গ্রহণ করেছেন। ক্লাস শেষে তারা দেখতে পান যারা মেডিটেশন করেছেন তাদের স্মৃতিশক্তি অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যদের তুলনায়।

৫. স্ট্রেস থেকে দূরে থাকুন: স্ট্রেস আপনার স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেওয়ার জন্য অনেকখানি দায়ী। স্ট্রেস আপনার সাময়িক স্মৃতিশক্তি নষ্ট করার সাথে সাথে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তিও নষ্ট করে থাকে। স্ট্রেস কমানোর সহজ এবং কার্যকরী উপায় হল লম্বা শ্বাস গ্রহণ করা। এটি মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে মস্তিষ্ককে সচল রাখে।

৬.ব্যয়াম: দ্রুত হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাইকেল চালানো অর্থাৎ হার্ট পাম্পিংকে প্রভাবিত করে এমন যে কোনো কার্ডিওরেসপিরেটরি এক্সারসাইজ আপনার শরীরের জন্য ভালো। মস্তিষ্কের টিসু্য গঠিত হয়েছে গ্রে ম্যাটার ও ফিলামেন্ট দিয়ে। ফিলামেন্টকে হোয়াইট ম্যাটারও বলা হয়, যার বিস্তৃতি গ্রে ম্যাটার কোষ থেকে। গ্রে ম্যাটারের সঙ্গে বিভিন্ন দক্ষতা ও কগনিটিভ সামর্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়লে গ্রে ম্যাটারের ভলিউমও বৃদ্ধি পায়। গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ বাড়লে কগনিটিভ সামর্থ্য বেড়ে যায়। এটা জেনে রাখা ভালো যে, এক্সারসাইজ বা শরীরচর্চা রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ায়।

৭.অ্যারোবিক এক্সারসাইজ: মেজাজ ভালো করা, স্মৃতিশক্তি বাড়ানো এবং বয়সের সাথে মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়া রোধ- সবগুলো উপকার একসাথে পেতে চান? অ্যারোবিক ব্যায়াম করুন। আপনার মস্তিষ্কের জন্য উপকারী, যেমনটা তা উপকারী আপনার হৃদয়ের জন্য”, বলেন একটি গবেষণার লেখকেরা। এই গবেষণাটি সম্প্রতি হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল ব্লগ “মাইন্ড অ্যান্ড মুড” এ প্রকাশিত হয়। আপনার বয়স যদি ৫০ এর ওপরে হয় তাহলে আপনার কাজে আসতে পারে অ্যারোবিক এবং রেজিস্ট্যান্ট এক্সারসাইজের মিশ্রণ, বলে ব্রিটিশ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা। ৩ মে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই তথ্যের সাথে সম্মতি প্রকাশ করে এতে দেখা যায়, ৬০-৮৮ বছর বয়সী মানুষের মাঝে ১২ সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে ৪ দিন ৩০ মিনিট হাঁটা তাদের মস্তিষ্কের এমন জায়গাকে সুস্থ করে তোলে যেখানে স্মৃতিভ্রংশের আশংকা ছিল।

এই অভ্যাসগুলোর পাশাপাশি ধূমপান, মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস করুন, এটি আপনাকে নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখবে। ছোটখাটো হিসাব করার জন্য ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা বন্ধ করুন। ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস বা ক্যালকুলেটরের উপর নির্ভরতা আমাদের মস্তিষ্ককে অলস করে দেয়।

যে ৮টি খাবার আপনার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করবে

একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট যেমন সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও এটি প্রয়োজন। মানুষের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পড়ে পুষ্টির, যা পাওয়া সম্ভব পুষ্টিকর খাবার থেকে। কিছু খাবার আছে যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে আপনার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে। আসুন পরিচিত হওয়া যাক সেই খাবারগুলোর সাথে।

১. গ্রিন টি: গবেষণার অনুযায়ী গ্রিন টি মস্তিষ্কের কাজ ভালোভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। ইউনিভার্সিটি অফ ব্যাসেল এক সমীক্ষায় দেখেছে যে, গ্রিন টি মস্তিষ্কের ইলেক্টিক্যাল সংযোগ বৃদ্ধি করে। যারা নিয়মিত গ্রিন টি পান করেন তারা কাজে অধিক মনোযোগ দিতে পারেন। দুই থেকে তিন কাপ গ্রিন টি পান করুন।

২. কফি: শরীরে ক্লান্তি দূর করতে কফি অতুলনীয়। এই কফি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে থাকে। কফিতে ক্যাফেইন নামক উপাদান আছে যা রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ ঠিক রেখে কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করে।

৩. ডার্ক চকলেট: অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ডার্ক চকলেট সম্পূর্ণ শরীরের জন্য উপকারী। এতে থাকা ক্যাফিন মানসিক স্বাস্থ্যের ভালো রাখতে সাহায্য করে। এটি নার্ভকে রিল্যাক্স করে উত্তেজনা কমিয়ে দেয়। যা কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এক টুকরো ডার্ক চকলেট খেলে তা আপনার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করবে।

৪. ফ্যাটি মাছ: চর্বিযুক্ত বা তেলযুক্ত মাছ স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে অনেক কার্যকরী। চর্বিযুক্ত মাছে ওমেগা-৩, ইপিএ, ডিএচএ আছে যা স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে কাজে মনোযোগ নিয়ে আসে। সাধারণত শরীরে ওমেগা-৩ এর অভাব হলে স্মরণশক্তি কমে যায়। মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড আছে।

৫. পানি: শরীর সুস্থ রাখার জন্য প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। পানি মস্তিষ্কে শক্তি প্রাদান করে থাকে। যার কারণে মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। এটি স্মরণশক্তি বাড়িয়ে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে থাকে।

৬. পালং শাক: পালংশাকে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট লুটিন রয়েছে যা কোনিটিভ ক্ষয় হ্রাস করে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল সমীক্ষায় দেখছেন যে, যেসকল নারীরা শাক জাতীয় সবজি গ্রহণ করেন তাদের কোগনিটিভ অনেক ধীর গতিতে হ্রাস পায়, যারা শাক জাতীয় সবজি গ্রহণ করেন তাদের তুলনায়।

৭. বাদাম: বাদামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে থাকে। প্রতিদিন এক আউন্স বাদাম খান আর দেখুন ম্যাজিক। বাদাম থেকে প্রয়োজনীয় অ্যাসেন্সিয়াল অয়েল এবং অ্যামিনো এসিড পাওয়া যায়।

৮. বিট: স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে বিট অতুলনীয়। বিট রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে। মস্তিষ্কে অক্সিজেন প্রবাহ সচল রাখে। প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় বিটের সালাদ বা তরকারি রাখুন। এটি আপনার স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।