সন্দেহাতীতভাবেই দেশের ইতিহাসের সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে দেশের ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানও বলে থাকেন বাঁহাতি এ ড্যাশিং ওপেনারকে। অন্তত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিসংখ্যানই কথা বলে তার পক্ষে।

বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তামিম। হাঁকিয়েছেন সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিও। এছাড়া দেশের ইতিহাসের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে করেছেন ১৩ হাজারের বেশি রান। ওপেনার তথা ব্যাটসম্যান তামিমের গুণকীর্ত্তন করা যাবে সারাদিন ধরে।

Loading..Copy video urlPlay / PauseMute / UnmuteReport a problemLanguageMox Player

তবে কজনই বা জানেন তামিম ইকবালের বোলিং সম্পর্কে। ব্যাটিংটা বাঁহাতে করলেও তামিম ইকবাল বোলিং করেন ডানহাতে। পুরোদস্তুর বোলারের মতো অ্যাকশনেই আয়েশি ভঙ্গিতে করেন অফস্পিন। দীর্ঘদিন যাবত আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ক্রিকেটে বল হাতে দেখা যাচ্ছে না।

নিয়মিত বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিং করলেও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বোলিং করেছেন মাত্র ৭টি ম্যাচে। তাও লম্বা কোনো স্পেলে নয়। পাঁচ টেস্টে পাঁচ ইনিংসে ঠিক পাঁচ ওভার এবং ওয়ানডে দুই ম্যাচ মিলে ছয়টি ডেলিভারি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র ৩৬ বলেই এখনও পর্যন্ত সীমাবদ্ধ তামিমের বোলিং ক্যারিয়ার।

তাতে কোনো উইকেট পাননি তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে একবার জাগিয়েছিলেন আউটের সম্ভাবনা। এছাড়া বাকি সময় শুধু হাতই ঘুরিয়েছেন তিনি। সবমিলিয়ে ৩৬ বলে খরচ করেছেন ৩৩ রান। টেস্ট ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে পাঁচ ওভার তথা ৩০ বল করেছেন তামিম ইকবাল। রান দিয়েছেন মাত্র ২০।

সাদা পোশাকের ক্রিকেটে তার বোলিংয়ের গল্পটা তুলে ধরা হলো

প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, ২০০৮

প্রায় এক যুগ আগের নিউজিল্যান্ড সিরিজ। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বৃষ্টির কারণে প্রথম তিনদিনই ভেসে যায় বৃষ্টিতে। চতুর্থ দিনে ব্যাট করতে নেমে ৬ উইকেটে ২৬২ রান করে ইনিংস ঘোষণা দেয় নিউজিল্যান্ড। বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে করে ১৬৯/৯ (ডিক্লেয়ার)।

শেষদিনে খেলার ফল যখন অনির্বায ড্র, তখন বল নিয়ে যেনো লটারি শুরু করেন আমাদের তৎকালীন অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। তার হাত ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের (প্রথমবারেরটা পরে আসবে) মতো বল করার সুযোগ পান তামিম।

তবে তামিমের লটারি ভাগ্য (!) খারাপ থাকায় তার আগেই জুনায়েদ সিদ্দিকি, মেহরাব জুনিয়র এমনকি অধিনায়ক নিজেও বোলিংয়ের সুযোগ পেয়ে যান। রাজিন সালেহ আর মুশফিকুর রহীম হাত ঘোরাননি সেদিন। ফলে বোলিং কার্ডের নয় নাম্বারে নিজের নাম উঠে যায় তামিমের।

মজার বিষয় হলো, তামিমের ওভারের পরই নিষ্ফলা ড্র মেনে নেয় নিউজিল্যান্ড। নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম ৩০ ওভারে এক উইকেট হারানো নিউজিল্যান্ড তামিমের ওভার থেকে নিতে পারে মাত্র ১ রান। অ্যারন রেডমন্ড তিন বল ঠেকিয়ে চতুর্থ বলে স্ট্রাইক দেন বাঁহাতি ওপেনার জেসি রাইডারকে। তিনি পরের দুই বল খেলে আম্পায়ারদের জানিয়ে দেন এই ম্যাচ এখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করা যায়।

প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, ২০০৯

২০০৯ সালের শ্রীলংকা সিরিজ। এবারও অধিনায়ক আশরাফুল। তার হাত ধরে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো বোলিং করার সুযোগ পান তামিম। দ্বিতীয়বারের মতো এবারও নয় নম্বরেই লটারি ভাগ্যে নাম উঠে তামিমের। তার আগে বোলিং করে ফেলেন অধিনায়ক নিজে, মেহরাব জুনিয়র, ইমরুল কায়েস এমনকি রকিবুল হাসানও।

যাইহোক বোলিংয়ে আসেন তামিম এবং বলা বাহুল্য এবারও তামিমের ওভারের পরই শেষ হয়ে যায় প্রতিপক্ষ দলের ইনিংস অর্থাৎ ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেয় শ্রীলঙ্কা। তামিম সেই ওভারে খরচ করেন মাত্র তিন রান।

প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, ২০১০

ঠিক পরের বছর দেশে আসে ইংল্যান্ড। এবার অধিনায়ক তামিমের বন্ধু সাকিব আল হাসান। টসে জিতে ফিল্ডিং নেন সাকিব। এবারও বোলিং নিয়ে যেন লটারি শুরু করেন সাকিব। এবার তামিমের নাম ওঠে আট নম্বরে। প্রথম দিনের একদম শেষ ওভারে তার হাতে বল তুলে দেন সাকিব।

ততক্ষণে ৮৯ ওভারে মাত্র ৩ উইকেটের বিনিময়ে ৩৭২ রান করে ফেলে ইংল্যান্ড। তামিমের বোলিংকে ঠিক অতটা সমীহ করার কিছু ছিল না অ্যালিস্টার কুক ও পল কলিংউডের জন্য। কিন্তু তামিম এদিন দেখার নিজের বোলিংয়ের ভেলকি। প্রথমবারের মতো তৈরি করে উইকেটের সম্ভাবনা।

সেই ওভারের প্রথম বলে লেগ বিফোরের মৃদু আবেদন হয়, দ্বিতীয় বলে স্টাম্পিং মিস করেন মুশফিক। তৃতীয় বলে লেগ বিফোরের আবেদন ছিলো আরও জোরালো। কিন্তু সেটি নাকচ করে দেন আম্পায়ার। তবে খালি চোখে মনে হচ্ছিলো, ঠিকই আউট ছিলেন কুক। সেই ওভারে তামিমের খরচা হয় ২ রান।

প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, ২০১০

একই সিরিজের পরের ম্যাচ। অধিনায়ক এক, প্রতিপক্ষও এক।তার ওপর আগের ম্যাচে উইকেটের সম্ভাবনাও জাগিয়েছিলেন তামিম। ফলে এ ম্যাচে সাত নম্বরেই তামিমকে বোলিংয়ে ডাকেন সাকিব। এবার এক ওভার বল করে মাত্র ৪ রান খরচ করেন তামিম।

প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ২০১২

বিশ্বকাপের বছর বাদ দিয়ে ঘরের মাঠে ২০১২ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ। অধিনায়ক বদলে এবার দায়িত্বে মুশফিকুর রহীম। ম্যাচের প্রথম ইনিংসেই তিনি ডাকেন তামিমকে। সেবারই প্রথম বাউন্ডারি হজম করেন ডানহাতি অফস্পিনার তামিম।

সে ওভারের প্রথম বলেই চার মেরে দেন শিবনারায়ণ চন্দরপল। পরের পাঁচ বলে আসে আরও পাঁচটা সিঙ্গেল, সঙ্গে একটা ওয়াইড। ব্যস ছয় বলে হয়ে যায় দশ রান এবং এর মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিম ইকবালের বোলিং অধ্যায়। সে ম্যাচের পর এখনও পর্যন্ত আর বোলিং করেননি তামিম।

এতক্ষণ গেলো টেস্ট ক্রিকেটে তামিম ইকবালের বোলিং ক্যারিয়ার। তিনি বোলিং করেছেন ওয়ানডে ক্রিকেটেও। এখানে খানিকটা খরুচে ছিলেন তামিম। দুই ম্যাচ মিলে ছয় বল করে ১৩ রান দিয়েছেন তিনি।

প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০০৮

২০০৮ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। সেই সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বোলিং প্রতিভার দেখানোর সুযোগ পান তামিম। ম্যাচের ফল তখন প্রায় নিশ্চিত। ফলে প্রোটিয়াদের ইনিংসের ৪৯তম ওভারে তামিমকে বোলিংয়ে ডাকেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

তখন জেতার জন্য ১২ বলে ১ রান করতে হতো দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তামিম বোলিংয়ে আসার পর প্রথম বলেই সরাসরি মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে দেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো বোলিং করার স্মৃতিটা খুব একটা সুখের জন্য তামিমের জন্য।

প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, ২০১০

২০১০ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজের শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচ। এবারও ম্যাচের ফল প্রায় নিশ্চিত। বাংলাদেশের করা ২৪৯ রানের জবাবে ৪২ ওভারেই ১ উইকেট হারিয়ে ২৪৫ রান করে ফেলে লঙ্কানরা। জয়ের জন্য বাকি ছিলো ৪৮ বলে ৫ রান।

তখন ৪৩তম ওভারে তামিমকে বল তুলে দেন সাকিব। প্রথম চার বলে একটি ওয়াইডসহ মোট তিন রান দেন তামিম। তবে পঞ্চম বলে উপুল থারাঙ্গা চার মেরে শেষ করে ম্যাচ এবং এরই মাধ্যমে রঙিন পোশাকেও বোলিং ক্যারিয়ারের ইতি চলে আসে তামিমের।