হঠাৎ করে গত বছর ক্রিকেটারদের আন্দোলন, অবস্থান ধর্মঘট, সমাবেশ আর আল্টিমেটামে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ক্রিকেটাঙ্গন। দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে কারো কারো আপত্তি থাকলেও বেশ কিছু দাবির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কেউই প্রশ্ন তোলেননি। বেশিরভাগই ছিল ক্রিকেটারদের ন্যায্য দাবি।

এর মধ্যে সাবেক ক্রিকেটার দিয়ে পরিচালিত ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ ‘কোয়াবের’ পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান ক্রিকেটার নিয়োগ বা মনোনীত করার দাবিও ছিল।

কিন্তু কেন যেন ওই আন্দোলনের পর থেকে সে দাবিটা স্তিমিত হয়ে গেছে। অথচ জানা গেছে কোয়াব সভাপতি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়, সহ-সভাপতি জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন এবং সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন; কিন্তু বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে সে অর্থে কোয়াব নিয়ে উৎসাহ কম বলেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে কোয়াব যদি নেতৃত্বহীন অবস্থায় থাকে, আন্দোলন করে কোয়াবের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের দাবি তুলে তারপর বর্তমান ক্রিকেটাররা যদি আর দায়িত্ব নিতে উৎসাহি না হন, তাহলে ক্রিকেটারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেন কে বা কারা?

ভাবছেন হঠাৎ এ প্রশ্নের অবতারনা কেন, এই প্রশ্ন উঠছে এই কারণে যে, করোনা যেভাবে গোট বিশ্বে জেঁকে বসেছে, যেভাবে প্রতিনিয়ত প্রাণ নাশের ঘটনা ঘটছে- তাতে যদি সত্যিই এবার প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ না হয়, তাহলে ক্রিকেটারদের যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে, অনেক ক্রিকেটারের যে আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে- তাদের কি হবে?

তাদের পাশে কারা দাড়াবেন? তাদের কিভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা যায়, কি করলে লিগ শেষ পর্যন্ত না হলেও শুধু প্রিমিয়ার লিগের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো শতাধিক ক্রিকেটারের একটা হিল্লে হবে? বোর্ডের কাছে এসব সময়োচিত দাবি উত্থাপন করবেন তাহলে কারা?

আশার কথা, ঢাকা লিগের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, সাবেক জাতীয় দলের ক্রিকেটার তুষার ইমরান ব্যক্তিগত উদ্যোগে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন তথা বিসিবির কাছে দুটি আবেদন করতে চান।

আজ সন্ধ্যায় জাগো নিউজের সাথে আলাপে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান, সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি মালিক তুষার ইমরান সে মানিবক আবেদন দুটি উপস্থাপনও করেছেন।

দেশের ক্রিকেটের এ পরিচিত মুখ ও অন্যতম সিনিয়র ক্রিকেটার বলেন, করোনার কারণে আমি মাশরাফি, তামিম, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহসহ সিনিয়র ক্রিকেটারদের সাথে আলাপ করতে পারিনি। তবে খুব শিগগিরই আমি তাদের সাথে কথা বলবো এবং আমার দুটি মানবিক প্রস্তাব আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলে বোর্ডের কাছে পেশ করবো।

কি সেই দুটি মানবিক আবেদন? তুষার ইমরান জানান, খুব সড়সড় কিছুই না। আমার প্রথম আবেদন থাকবে বোর্ডের কাছে, তাহলো- বোর্ডের সাথে বাৎসরিক চুক্তির অধীনে থাকা ১৭ ক্রিকেটারের সাথে আরও দশ-বারোজন ক্রিকেটার আছে যারা ঘুরেফিরে জাতীয় দলে খেলে।

মানে ২৭-২৮ বা সর্বোচ্চ ৩০ জন ক্রিকেটার মাসিক বেতন, জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি বিপিএলেও একটা মোটা অংকের অর্থ পায়; কিন্তু দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অংশটা অত আর্থিক সুবিধা পায় না। পাবার অবকাশও নেই। তাদের জন্য মানে আমরা যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মানে বিসিএল আর এনসিএল খেলি, তাদের আরও অন্তত ৬০জন ক্রিকেটারকে বোর্ড গড়ে মাসে ২০, ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেয়।

সব মিলে অন্তত ৭০-৮০ জনের মত (আমি ঠিক সংখ্যাটা সঠিক বলতে পারবো না) ক্রিকেটার ফাস্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলার জন্য বেতন পায়। কিন্তু এর বাইরেও অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন ক্রিকেটার থাকে যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও কোন দলের ১৪ বা ১৫ জনে আসে না বা জায়গা পায় না। তাদের কি হবে?

সেই ক্রিকেটারের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। বোর্ডের কাছে আমার প্রস্তাব, যদি সত্যিই লিগ না হয় তাহলে অন্তত ওই ৬০ থেকে ৭০ জন ক্রিকেটারকে আগামী এক বছর গড়ে অন্তত কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা করেও বেতন দিলে ভাল হয়। ওই ক্রিকেটাররা হয়ত ঢাকা লিগ খেলে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সাত-আট লাখ টাকার মত করে পেত। মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা করে পেলে তারাতো অন্তত বছরে লাখ তিনেক টাকা করে পাবে। তাতে তাদের লিগ না হলে যে ক্ষতি হবে, তা না পোষালেও একটা হিল্লে অন্তত হবে।’

তুষারের আন্তরিক আবেদন, ‘লিগ শেষ পর্যন্ত না হলে ওই মানবিক আবেদনটা বোর্ড গ্রহণ করলে ক্রিকেটারদের একটা বড় অংশ চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার হাত থেকে অন্তত কিছুটা হলেও রেহাই পেত।’

এর পাশাপাশি লিগ না হলে যারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে বোর্ডের কাছ থেকে বেতন পান, তাদের ৬ মাসের বেতন অগ্রিম দিয়ে দেবার আন্তরিক অনুরোধও করেছেন তুষার। তাতে করে যারা শুধু ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলে চলেন, তাদের হাতেও এককালিক অল্প কিছু টাকা আসবে। সেটা হয়ত লিগ খেলে যা পেতেন, তার মত নয়। তবে অন্তত ঠেকা কাজ চালানোর মত হবে বলে বিশ্বাস তুষার ইমরানের।

বোর্ড কর্তারা কি ক্রিকেটারদের সে মানবিক আবেদন বিবেচনায় আনবেন? সত্যিই লিগ না হলে অন্তত শতাধিক ক্রিকেটারের আর্থিক ক্ষতি পোষাতে যে সত্যিই আন্তরিক হওয়া জরুরি হয়ে দেখা দেবে?