রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা ‘করোনা পোস্টিং’ আতঙ্কে ভুগছেন। করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করতে গিয়ে নিজেরাই সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়তে পারেন-এমন আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা দিতে রাজধানী ও এর উপকণ্ঠে ১১টি হাসপাতালসহ সারাদেশে হাসপাতাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলো হলো-উত্তরা কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল, কমলাপুর আউটার সার্কুলার রোডের বাংলাদেশ রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, নয়াবাজারের মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুরে বড় বাঘের মিরপুর মেটারনিটি হাসপাতাল, কামরাঙ্গীরচরের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, সাভারের আমিন বাজার ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও জুরাইনের সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতাল।

ইতোমধ্যেই উত্তরা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতাল এবং গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত কতে এসব হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সুবিধাসহ আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) বেডসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সদের পদায়ন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মেডিসিন ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চিকিৎসকদের সংযুক্তিতে সাময়িকভাবে পদায়ন করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি হাসপাতালে সাময়িকভাবে বেশ কিছু সংখ্যক চিকিৎসক-নার্সকে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হয়েছে। পদায়নকৃত চিকিৎসকদের অধিকাংশ মেডিসিন এবং অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের।

শুধু রাজধানীতেই নয়, বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়ে ভাইরাসজনিত চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আন্তঃসমন্বয়ের মাধ্যমে জরুরি প্রয়োজনে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে সংযুক্তিতে নার্সিং ক্ষমতা পদায়নের ক্ষমতা সাময়িকভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনকে প্রদান করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

তবে করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করতে গিয়ে নিজেরাই সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়তে পারেন-এমন আশঙ্কায় আতঙ্কিত রয়েছেন অসংখ্য চিকিৎসক-নার্স।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চিকিৎসক-নার্স বলেন, করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার জন্য যেসব হাসপাতাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, এর অধিকাংশ এখনও প্রস্তুত হয়নি। তাছাড়া চিকিৎসক-নার্স ও অন্যান্য সহযোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহ করা হয়নি। তাই এসব হাসপাতালে কোনো রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

ইতোমধ্যে কয়েকজন চিকিৎসক রোগীদের সংস্পর্শে এসে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

চিকিৎসক-নার্সদের ভাষ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দুর্যোগকালীন সময়ে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক-নার্সকে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ প্রদান করিয়ে এনেছে। সেসব চিকিৎসক-নার্সদেরকেই এ মুহূর্তে পদায়ন করা উচিত। কিন্তু তাদেরকে বাদ দিয়ে সাধারণ চিকিৎসক-নার্সদের পদায়ন দেয়া হচ্ছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সরা নানা অজুহাত দেখিয়ে ছুটির দরখাস্ত করেছেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নার্স নেতা জানান, নার্সদের পদায়নের বিষয়টি নার্সিং অধিদফতরের মাধ্যমে করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নার্স নিয়োগ করা হলে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও যোগ্য নার্সদের বদলে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত নার্সদের পদায়ন করে তাদের ঝুঁকিতে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পিপিই সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে চিকিৎসক-নার্সরা আক্রান্ত হবেন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসক-নার্স খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বরাবরই বলে আসছেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবার সঙ্গে যারা জড়িত থাকবেন, তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

তবে মহাপরিচালকের কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না চিকিৎসক-নার্সরা। নতুন ধরনের ভয়াবহ ছোঁয়াচে ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়তে রাজি নন তারা।