অতীতের চকলেটের সঙ্গে আজকের দিনের চকলেটের মিল খুবই কম। ইতিহাস জানান দেয়, অতীতে চকলেট কোনো মিষ্টি ও ভক্ষণযোগ্য নয়, বরং ছিল তিতা স্বাদের খুবই সম্মানজনক পানীয়!

প্রাচীন মায়া সভ্যতার যুগেও ছিল চকলেটের অস্ত্বিত্ব। এমনকি তারও আগে, দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকোর প্রাচীন ওলমেক সভ্যতায়ও এর প্রচলন খুঁজে পেয়েছেন ইতিহাসবিদরা। ‘চকলেট’ শব্দটা শুনলেই মিষ্টি ক্যান্ডি বার ও মনোরম মিষ্টান্নের ছবি চোখে ভেসে ওঠে; তবে সুদূর অতীতের চকলেটের সঙ্গে আজকের দিনের চকলেটের মিল খুবই কম। ইতিহাস জানান দেয়, অতীতে চকলেট কোনো মিষ্টি ও ভক্ষণযোগ্য নয়, বরং ছিল তিতা স্বাদের খুবই সম্মানজনক পানীয়!

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঘরে বসে কাটানো দিনগুলোতে, চলুন পাঠক, হিস্টোরি ডটকমের সূত্র ধরে জানি চকলেটের ইতিহাস…


কোকো গাছ যেভাবে এলো

কোকো গাছের ফল থেকে তৈরি হয় চকলেট। সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ আমেরিকায়  পাওয়া যায় এ গাছ। গুটি গুটি ফলগুলোর একেকটিতে ৪০টির মতো বিন বা শুটি থাকে। শুটিগুলো শুকিয়ে, তারপর পুড়িয়ে বানানো হয় কোকো বিন। 

কে কখন কীভাবে প্রথম এই উপায় আবিষ্কার করেছিলেন, জানা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ামের কালচারাল আর্ট কিউরেটর হায়েস লেভিস জানান, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকেই প্রাচীন ওলমেক সভ্যতার মানুষেরা নৌযান ভরে কোকো ফল নিয়ে আসতেন।

ধারণা করা হয়, ওলমেকরা কোকো দিয়ে তাদের উৎসব-আয়োজনের বিশেষ পানীয় বানান। অবশ্য ইতিহাসে যেহেতু এ কথা স্পষ্টভাবে লেখা নেই, ফলে এ সম্পর্কে দ্বিমত রয়েছে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, ওলমেকরা স্রেফ তরল পদার্থ হিসেবেই কোকো বিনগুলো ব্যবহার করতেন কিংবা গুটিগুলো সাজিয়ে রাখতেন।


মায়া সভ্যতায় চকলেটকে সম্মানজনক পানীয় হিসেবে গণ্য করা হতো। মায়া সভ্যতায় ওলমেকরাই যে কোকো সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞান সেন্ট্রাল আমেরিকান মায়া সভ্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের সন্দেহ নেই। মায়া সভ্যতার লোকেরা চকলেট শুধু পানই করতেন না, একে খুব সমীহও করতেন।
মায়ার লিখিত ইতিহাসে উল্লেখ আছে, বিশেষ বিশেষ লেনদেন চূড়ান্ত করার অনুষ্ঠানে চকলেট পানীয় পরিবেশন করা হতো।

যদিও মায়া সংস্কৃতিতে চকলেটের গুরুত্ব ছিল, তবে এটি শুধু সম্পদশালী ও ক্ষমতাধরদের জন্য সংরক্ষণ করা হতো না, বরং প্রায় সবাই স্বাদ নিতে পারার মতোই সহজলভ্য ছিল। অনেক মায়া পরিবারই প্রতি বেলার আহারে চকলেটের স্বাদ নিতেন। মায়া সভ্যতার সময়কালের চকলেট ছিল ঘন ও ফেনাময়; এমনকি তার সঙ্গে লাল মরিচ, মধু কিংবা পানি মেশানো হতো।


মুদ্রা হিসেবে কোকো বিন

১৪২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত  আজটেক সভ্যতার লোকেরা চকলেটকে আরেকটি স্তরে নিয়ে গেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন, এটি স্বয়ং ঐশ্বরিক উপহার। মায়াদের মতোই তারাও সুসজ্জিত পাত্রে গরম ও ঠাণ্ডা ক্যাফেইন, স্পাইসড চকলেট পানীয় পান করতেন; তবে খাবার ও অন্যান্য পণ্য কিনতে তারা মুদ্রা হিসেবেও কোকো বিন ব্যবহার করতেন। আজটেক সংস্কৃতিতে কোকো বিনকে স্বর্ণের চেয়ে দামি হিসেবে গণ্য করা হতো।

আজটেক চকলেট ছিল মূলত উচ্চবিত্তের বিলাসিতা; যদিও বিয়ে কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মাঝে মধ্যে নিম্নবিত্তরাও এর স্বাদ উপভোগ করতেন।

আজটেক চকলেটের খাদক হিসেবে সবচেয়ে কুখ্যাতি আছে দাপুটে শাসক দ্বিতীয় মন্টেজুমার। ১৪৬৬ সালে জন্ম নেওয়া এই আজটেক শাসক বেঁচে ছিলেন ১৫২০ সাল পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, শক্তিমান ও বীর্যবান হতে তিনি প্রতিদিন গ্যালন ভর্তি চকলেট পান করতেন। আরও বলা হয়ে থাকে, নিজের সামরিক বাহিনীর জন্যও কোকো বিন সংরক্ষণ করতেন তিনি।


ইউরোপে প্রথম চকলেট আসে স্পেনে; সেই হট চকলেটের বেশ কদর ছিল

ইউরোপে চকলেটের আবির্ভাব কখন ঘটেছে— এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলে তারা একমত, ইউরোপীয় দেশের মধ্যে প্রথমে স্পেনেই এসেছিল এটি। একদল মনে করেন, আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার পথে কোকো বিন আবিষ্কার করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস; ফেরার পথে সেগুলো স্পেনে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। এটি ১৫০২ সালের কথা।

আরেক দল মনে করেন, আজটেকে মন্টেজুমার দরবারে চকলেটের খোঁজ প্রথম পেয়েছিলেন স্প্যানিশ বীর হারনান কার্টেজ। দেশে ফেরার সময় সঙ্গে করে কোকো বিন নিয়ে এসেছিলেন তিনি। চকলেট সম্পর্কে নিজের জ্ঞান তিনি কঠোরভাবে গোপন রেখেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। 

অন্য একদলের ভাষ্য, ১৫৪৪ সালে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ গুয়াতেমালান মায়া ভীক্ষুদের কাছ থেকে কোকো বিন উপহার পেয়েছিলেন।

স্পেনে চকলেট যেভাবেই আসুক, ১৫০০-এর দশকের শেষভাগে স্প্যানিশ দরবারে এটি বেশ সমাদৃত হয়। অন্যদিকে স্পেন চকলেট আমদানি শুরু করে ১৫৮৫ সালে। ইতালি ও ফ্রান্সসহ অন্য যেসব ইউরোপীয় দেশের অভিযাত্রীরা সেন্ট্রাল আমেরিকায় ভ্রমণ করতেন, তারাও সেখানে চকলেটের খোঁজ পান এবং নিজ নিজ দেশে নিয়ে আসেন।

সহসাই ইউরোপজুড়ে চকলেট ম্যানিয়া ছড়িয়ে পড়ে। চাহিদা হু-হু করে বাড়তে থাকায় কোকোর চাষাবাদ ও চকলেট উৎপাদনে খাটতে থাকেন হাজারও ক্রিতদাস।

আজটেকদের চকলেট ইউরোপিয়ানদের তৃপ্ত করতে পারেনি। আখের রস, দারুচিনি ও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে নিজেদের পছন্দমতো হট চকলেট বানাতে শুরু করেন তারা।

সহসাই লন্ডন, আমস্টারডম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় শহরে চকলেটের দোকান গড়ে উঠতে থাকে।


১৬৪১ সালে একটি স্প্যানিশ জাহাজে করে ফ্লোরিডায় চকলেট আনা হয়। ধারণা করা হয়, ১৬৮২ সালে বোস্টনে প্রথম আমেরিকান চকলেট হাউস চালু হয়। ১৭৭৩ সালের দিকে একটি বড় আমেরিকান উপনিবেশে কোকো বিন আমদানি করা হয়। সেখানকার সব শ্রেণির মানুষ উপভোগ করতে থাকেন চকলেটের স্বাদ।

১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল, আমেরিকান বিপ্লবের দিনগুলোতে সামরিক বাহিনির রেশন তালিকায় যুক্ত হয় চকলেট; কখনো কখনো সৈনিকদের বেতন হিসেবে টাকার বলে এটি দেওয়া হতো। বলে রাখি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও সৈনিকদের রেশন হিসেবে চকলেট দেওয়া হয়েছে।


ইউরোপে যখন প্রথম চকলেট এলো, তখন এটি এতই দামি ও বিলাসী জিনিস ছিল, শুধু বড়লোকেরাই এর স্বাদ নিতে পারতেন। তবে ১৮২৮ সালে ডাচ রসায়নবিদ কোয়েনরাড জোহানেস ভ্যান হাউটেন লবণের ক্ষারের সঙ্গে কোকো বিন মিশিয়ে এক ধরনের পাউডার চকলেট উদ্ভাবন করেন, যেটি খুব সহজেই পানিতে মিশিয়ে পান করা যেত।

প্রক্রিয়াটি ‘ডাচ প্রসেসিং’ নামে খ্যাতি পায়; অন্যদিকে, এভাবে বানানো চকলেটকে ডাকা হয় কোকো পাউডার বা ‘ডাচ কোকো’।

ধারণা করা হয়, কোকো প্রেসেরও উদ্ভাবন করেছিলেন ভ্যান হাউটেন; যদিও কেউ কেউ মনে করেন সেই যন্ত্রের উদ্ভাবক আসলে ভ্যানের বাবা। কোকো প্রেসের মাধ্যমে রোস্টেড কোকো বিনগুলো থেকে কোকো বাটার আলাদা করা হতো। ফলে কোকো পাউডার বানানো সহজ হয়ে ওঠে। এভাবে নানা স্বাদের, নানা ধরনের চকলেট তৈরি হতে থাকে।

ডাচ প্রসেসিং ও চকলেট প্রেস— দুটোই  চকলেটকে সব শ্রেণির মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসে। চকলেটের বহুল উৎপাদনকেও ত্বরাণ্বিত করে এগুলো।


উনবিংশ শতকের বেশির ভাগ সময় পর্যন্ত চকলেটকে পানীয় হিসেবেই উপভোগ করা হতো; কখনো কখনো তাতে পানির বদলে মেশানো হতো দুধ। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ চকলেট কোম্পানি জে. এস. ফ্রাই অ্যান্ড সনস প্রথমবার চিনি, তরল চকলেট ও কোকো বাটার মিশিয়ে চকলেট বার উৎপাদন করে।

১৮৭৬ সালে সুইস চকলেট ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল পিটার প্রথম চকলেটের সঙ্গে দুধের গুড়ো মিশিয়ে মিল্ক চকলেট উৎপাদন করেন। এর কয়েক বছর পরই বন্ধু হেনরি নেসলের সঙ্গে তিনি নেসলে কোম্পানি গড়ে তোলেন এবং মিল্ক চকলেটকে বড় পরিসরে বাজারে ছড়িয়ে দেন।

উনবিংশ শতক ধরেই বাজারে চকলেট বেশ দাপট দেখালেও তখনো সেটি ছিল শক্ত, এবং চুষে খাওয়ার অনুপযুক্ত। ১৮৭৯ সালে, আরেক সুইস চকলেট ব্যবসায়ী রুডলফ লিন্ড এমন এক মেশিন উদ্ভাবন করেন, যেটি এমনভাবে মিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম, যার ফলে চকলেট হয়ে ওঠে মসৃণ ও কোমল।

উনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের প্রথমভাগে ক্যাডবুরি, মার্স, নেসলে ও হার্সলের মতো কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মিষ্টি চকলেট উৎপাদন ও বাজারজাত করতে থাকে।


আধুনিক সময়ের চকলেট খুবই মসৃণ ও সুস্বাদু। অবশ্য কিছু কোম্পানি এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখে শক্ত চকলেটও উৎপাদন করছে। এখন একদিকে যেমন পানীয় চকলেট পাওয়া যায়, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন ধরন ও স্বাদের ভক্ষণযোগ্য চকলেটও। এর মধ্যে শেষোক্ত ধরনের চকলেটের চাহিদাই বেশি।

অবশ্য খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে চকলেট বার খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়; তাই দিন দিন সেটির জায়গা দখল করে নিচ্ছে ডার্ক চকলেট। এটি হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো এবং উদ্বেগ কাটাতেও সাহায্য করে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।