জীবনের মোড় ঘুরাতে থেরাপি কার্যকর। তবে সবসময় সেটা আপনার জন্য ইতিবাচক বা মঙ্গলজনক হবে কিনা তা বলা মুশকিল। চলুন তাহলে আজকে আমরা জেনে নেই কি কি লক্ষণ দেখা দিলে আপনার জন্য থেরাপি নেওয়া আবশ্যক বা দরকারি।

১. চরম বিষণ্ণতা কিংবা রাগ: নিজের আবেগ অনুভূতির উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা ভালো কোন লক্ষণ নয়। তবে এর পরিত্রাণে পেশাদার চিকিৎসা বা সহযোগিতা প্রয়োজন।

সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত এক লেখায় মনোবিজ্ঞানী ডেভিড স্যাক বলেন, ‘আপনার খাওয়া, ঘুম এবং নিত্যদিনের কাজকর্ম যদি স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে চলে যায়, কিংবা পরিবার পরিজন ও বন্ধুদের সাহচর্য থেকে নিজেকে বিরত রাখতেই পছন্দ করেন তাহলে এর থেকে বেশী কোন প্রভাব বিস্তার করার আগেই দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন’।

তিনি এও বলেন, ‘যদি এই মানসিক পরিস্থিতি থেকে আপনি বেঁচে থেকে কি হবে কিংবা সুইসাইড করার মত কথা চিন্তা করতে শুরু করেন তাহলে এই মুহূর্তেই আপনার একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্যের প্রয়োজন’।

২. পছন্দে অপছন্দ: নিউ ইয়র্ক সিটির এক প্রাইভেট ক্লিনিকের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মারিশা আল্টার বলেন, ‘যখন আপনি অনুভব করেন যে আপনার পছন্দের কাজগুলো এখন আর আগ্রহের সৃষ্টি করছে না তখন এর কারণ বের করতে আপনার উচিত একজন থেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ করা’।

তিনি আরও বলেন, ‘হতে পারে ঐ ব্যক্তি কোন সীমাবদ্ধতার জালে আটকে আছেন, কিংবা তিনি গভীর হতাশায় ভুগছেন’। একজন থেরাপিস্ট আপনার সমস্যার প্রেক্ষিতে আপনাকে থেরাপি দিবেন, আপনার সমস্যার মূল্যায়ন করবেন। সেই সাথে কি কারণে আপনি আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন সেই কারণ নির্ধারণের সাথে সমস্যা সমাধানের রাস্তা বা উপায় ও নির্ধারণ করে দিবেন।

৩. সামাজিক সংস্পর্শতা থেকে বিরত: আশেপাশের মানুষের মধ্যে থেকে যখন নিজের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয় তখনি একজন মানুষ থেরাপি গ্রহণ করেন। 

ড. আল্টার এর মতে, ‘যদি আপনি নিজেকে কোলাহলপূর্ণ জায়গা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলেন, জাঁকজমক কিংবা উৎসব অপছন্দ করেন এমনকি নিজের পরিবার পরিজন ও বন্ধুদের সংস্পর্শে আসতেও দ্বিধা বোধ করেন তাহলে হয় আপনি নিজের উপস্থিতি নিয়ে ভীত কিংবা অপ্রাচুর্যতার শূন্যতায় ভুগছেন’। যখন উদ্বিগ্নতা আপনার প্রাত্যহিক কাজ কর্ম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাঁধার সৃষ্টি করে তখন থেরাপি প্রথম কার্যকরী ধাপ হিসেবে কাজ করে।

৪. খামখেয়ালি জীবনযাপন ও আচরণ: মাঝে মাঝে স্বাভাবিক জীবনের বাইরে যেয়ে নিজেরে উপভোগ করা খারাপ কিছুনা। তবে এই উপভোগ করতে যেয়ে নিজের সামগ্রিক সত্তাকে বিলিয়ে দেওয়াটাও ভালো কাজ না। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনার এক প্রাইভেট ক্লিনিকের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রায়ান হোয়েস বলেন, ‘যখন আপনি আপনার সামর্থ্যের বাইরে যেয়ে অ্যালকোহল ও ড্রাগস সেবনের দিকে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে যাবেন ও খরচ করবেন, ঘন ঘন পাগলামি সম্পর্কে জড়াবেন, কিংবা অন্য মানুষের সাথে উগ্র বা বাজে আচরণ করবেন তখন সেটা গভীর কোন সমস্যার ইঙ্গিত দেয়’।

কঠিন পরিস্থিতি বা আবেগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে কিংবা সেটিকে এড়িয়ে চলার কারণ হিসেবেই আপনি এই আচরণ করেন। প্রফেশনাল বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কিংবা থেরাপিস্টের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমেই এই সমস্যা সৃষ্টির মূল কারণ খুঁজে বের করা ও সমাধান করা সম্ভব।

৫. সম্পর্কে অনীহা: প্রতিনিয়ত বন্ধুদের সাথে কলহ লেগে যাওয়া কিংবা অন্যের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া যদি আপনার অভ্যাসের অন্তর্গত হয়ে থাকে তাহলে এখনি একজন থেরাপিস্টের সাহায্য নিন। ভালোবাসার সম্পর্ককেও যখন কঠিন মনে হয় কিংবা সম্পর্ক ধরে রাখতে ইচ্ছে হয়না তখন পেশাদার থেরাপিস্ট এর সাথে কথা বলার উত্তম সময়।

ড. আল্টার বলেন, ‘জীবনের প্রথম দিকেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়’। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি থেরাপিস্টের সাথে আপনার সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেন তাহলে সেটা বর্তমান পরিস্থিতি সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে’।

ড. হোয়েস এর মতে, ‘অন্যদের সাথে আপনি কিভাবে কথা বলবেন বা যোগাযোগ করবেন সে ব্যাপারে আপনি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। অথবা থেরাপিস্টের সাথে আপনার বউ, বন্ধু, বস কিংবা ভালোবাসার মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলেন সেটার রোল প্লে বা চর্চা করে দেখতে পারেন। এটি আপনার সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে’।

৬. মানসিক আঘাত বা অসুস্থতা: ড. আল্টার বলেন, ‘কিছু মানসিক কারণে দুঃখ-দুর্দশা কাটিয়ে উঠার জন্য মানুষ থেরাপি গ্রহণ করে থাকে। যেমন- ভালোবাসার মানুষের বা পরিবারের কোন সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু, সম্পর্কে দুর্দশা, গর্ভপাত বা সন্তান হারানো, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার ইত্যাদি।

তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি শৈশবে যৌন হয়রানির মত দুষ্কর্মের শিকার হয়ে সেই স্মৃতি ভুলার জন্য ও অনেকে জীবনের কোন এক মুহূর্তে এসেও থেরাপির আশ্রয় নেন’। যদি কোনো ঘটনা আপনার স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা প্রদান করে, ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করে, পরিবার পরিজন ও সম্পর্কে দূরত্বের সৃষ্টি করে তাহলে এখনি একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

৭. নিজেকে অনুধাবন: ড. হোয়েসের মতে, ‘কোন কোন ব্যক্তির কাছে থেরাপি হল নিজের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার উপায়’।

আপনি কেন পছন্দের ক্যারিয়ার এ যোগ করলেন? কেন আপনি অপরিচিত লোকজনের সাথে সম্পর্কে জড়াচ্ছেন? আপনি কেন কোন বিষয়ে গড়িমসি করছেন বা পাত্তা দিচ্ছেন না? যারা বেশি জোরে কথা বলে তাদের কে আপনার বিরক্ত লাগার কারণ কী? 

হোয়েস বলেন, ‘আমরা কীভাবে কথা বলি বা চিন্তা করি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারাটা খুবই শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে’।

৮. অধিক সহযোগিতা প্রয়োজন: স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সমস্যায় পড়ার পরেই সমস্যা সমাধানে সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু সময়ে মানুষ কোন কারণ ছাড়াই থেরাপি নিতে চায়। তাঁর কোন অসুস্থতা চিকিৎসা গ্রহণ এর প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও সে সেটা অনুভব করে। মূলত তাঁরা চায় যে তাদের পরিচিত সার্কেলের বাইরের কেউ তাদের কথাগুলো শুনুক।

ড. হোয়েস বলেন, ‘যখন আপনি বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পর্কে ভাঙ্গন, চাকরি হারানো, প্রিয় কারো মৃত্যুতে শোকে মলিন তখন থেরাপির থেকে উত্তম আর কিছু হয় না। কারণ এখানে কেউ আপনার চাহিদা বা সমস্যা নিয়ে আপনাকে জ্ঞান দিবে না বা কথা শুনাবে না। কিংবা আপনার অসুবিধাকে কেউ তাদের স্বার্থের কাজে ব্যবহার করবে না।

৯. ব্যর্থ প্রচেষ্টা: সাইক সেন্ট্রাল (Central) নামের এক মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সামাজিক মাধ্যমের উদ্ভাবক ও প্রতিষ্ঠাতা জন এম গ্রহল (John M Grohol) বলেন, ‘কখনো কখনো পরিস্থিতি সামলাতে আমরা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি সেটা ব্যর্থ হয়’।

তিনি বলেন, ‘যদি এমন হয়ে থাকে যে আপনি নিজের কোন একটি বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন, আপনার বন্ধুর সাথে আলোচনা করেছেন, আত্ম-সহযোগিতার বিভিন্ন ধাপ ও চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনো সন্তোষজনক ফল পান নি তখনই আপনাকে একজন থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে।