সংখ্যার হিসেবে বাকি নয়টি অঙ্কের মতোই একটি অঙ্ক হলো ০ (শূন্য)। যার আপাতদৃষ্টিতে কোন মূল্য নেই। তবে অন্য সংখ্যার ডানে বসলে আবার মহামূল্যবান। একই কথা বলা চলে ক্রিকেটের বেলাতেও।

যখন কোন ব্যাটসম্যান করেন ০ রান, তখন ধরা হয় তার ফর্ম ভালো নেই বা ভালো খেলতে পারছেন না। কিন্তু কোন বোলার যখন ০ রানে ব্যাটসম্যানকে আউট করতে সক্ষম হয়, তখন সেই বোলারকেই ধরা হয় ভালো বোলার হিসেবে।

অর্থাৎ সংখ্যার মতো ক্রিকেট মাঠেও রয়েছে শূন্যের হরেক ব্যবহার। ক্রিকেটে শূন্যকে বলা হয় ডাক বা হাঁস। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো ক্রিকেটে ‘হাঁস’ পাওয়া ব্যাটসম্যানদের যত চমকপ্রদ তথ্য:

৫৯- আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ শূন্য তথা ডাক মেরেছেন শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন। তিন ফরম্যাট মিলে তিনি মোট ৫৯ বার আউট হয়েছেন শূন্য রানে। তবে তিন ফরম্যাটের আলাদা হিসেব করলে কোনোটিতেই নেই মুরালি।

টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ৪৩ বার শূন্য রানে আউট হয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি পেসার কোর্টনি ওয়ালশ। ওয়ানডে ফরম্যাটে এই বিব্রতকর রেকর্ডের মালিক মুরালির স্বদেশি ব্যাটসম্যান সনাৎ জয়াসুরিয়া। তিনি শূন্যতে আউট হয়েছেন ৩৪ বার। আর টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ১০ বার করে ডাক মেরেছেন তিলকারাত্নে দিলশান, উমর আকমল এবং কেভিন ও’ব্রায়েন।

২২- স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ডাকের রেকর্ড দুই সাবেক অধিনায়কের। শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক মারভান আতাপাত্তু এবং অস্ট্রেলিয়ান সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ- দুজনই নিজেদের টেস্ট ক্যারিয়ারে ২২টি করে ডাক মেরেছেন।

এর মধ্যে আতাপাত্তুর ক্যারিয়ারের শুরুটা আবার ছিল শূন্যেই মোড়া। ক্যারিয়ারের প্রথম ছয় ইনিংসের পাঁচটিতেই শূন্য রানে ফিরেছিলেন তিনি, অন্যটিতে করেছিলেন মাত্র ১ রান। সেই আতাপাত্তুই পরবর্তী ক্যারিয়ারে ৬ ডাবল সেঞ্চুরিসহ মোট ১৬টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন।

৫৩- টেস্ট ক্রিকেটে এখনও পর্যন্ত ৫৩ জন ব্যাটসম্যান নিজেদের অভিষেক টেস্টেই শূন্য রানে আউট হয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ৪৪ জন এবং নারী ক্রিকেটে ৯ জন খেলোয়াড় অভিষেকে শূন্য রানে আউট হন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটসম্যান গ্রাহাম গুচের। নিজের পরবর্তী ক্যারিয়ারে ২০ সেঞ্চুরিতে ৮৯০০ রান করেছেন।

এছাড়া বেশ কিছুদিন দক্ষিণ আফ্রিকাকে নেতৃত্ব দেয়া বাঁহাতি ওপেনার ডিন এলগার নিজের অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই আউট হয়েছিলেন শূন্য রানে। আভিধানিক ভাষায় একে বলে ‘পেয়ার’। টেস্ট ক্রিকেটে এই পেয়ারের রেকর্ড নিউজিল্যান্ডের সাবেক পেসার ক্রিস মার্টিনের দখলে। তিনি মোট ৭টি টেস্টে দুই ইনিংসেই আউট হয়েছেন শূন্য রানে।

২০- নারী ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি শূন্যের রেকর্ডটা যৌথভাবে তিনজনের। ভারতের ঝুলন গোস্বামী, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেবেন্দ্র ডটিন এবং ইংল্যান্ডের লুসি পিয়ারসন- তিনজনই সমান ২০টি করে ডাক মেরেছেন। এর মধ্যে পিয়ারসন মাত্র ৪৬ ইনিংসে ব্যাটিং করে ২০ বারই ফিরেছেন খালি হাতে।

নারীদের টেস্টে সবচেয়ে বেশি ৬টি ডাক পিয়ারসনের, নারী ওয়ানডে ঝুলনের ডাক ১৭টি এবং নারী টি-টোয়েন্টিতে ড্যানিয়েল ওয়েট খালি হাতে ফিরেছেন ১২টি ম্যাচে।

৭৭- সবচেয়ে বেশি বল খেলে ডাক মারার রেকর্ডটা নিউজিল্যান্ডের সাবেক পেসার জিওফ অ্যালটের। ১৯৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অকল্যান্ড টেস্টে ১০১ মিনিট ব্যাটিং করে ৭৭ বল খেলে শূন্য রানে আউট হন তিনি। টেস্টে পঞ্চাশের বেশি বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়া বাকি তিনজন ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসন (৫৫), রিচার্ড এলিসন (৫২) এবং পিটার সুচ (৫১)।

ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বল খেলে ডাক মারার রেকর্ড নিজের করে রেখেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ব্যাটসম্যান রুনাকো মর্টন। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩১ বল খেলেও রানের খাতা খোলা হয়নি তার।

৫- টেস্ট ক্রিকেটে টানা সবচেয়ে বেশি ডাক মারার রেকর্ড যৌথভাবে তিনজনের দখলে। অস্ট্রেলিয়ার বব হল্যান্ড, ভারতের অজিত আগারকার এবং পাকিস্তানের মোহাম্মদ আসিফ- তিনজনই টানা ৫টি করে ডাক মেরেছেন। এর মধ্যে আগারকার আবার একই সিরিজে টানা পাঁচ ইনিংসে ফিরেছেন শূন্য রানে।

ওয়ানডে ক্রিকেটে টানা সবচেয়ে বেশি ডাক মারার রেকর্ড যৌথভাবে পাঁচজনের দখলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের গাস লগি, শ্রীলঙ্কার গালাগে বিক্রমসিংহে, জিম্বাবুয়ের হেনরি ওলোঙ্গা, ইংল্যান্ডের ক্রেইগ হোয়াইট এবং শ্রীলঙ্কা লাসিথ মালিঙ্গা- পাঁচজনই টানা ৪টি ম্যাচে আউট হয়েছেন শূন্য রানে।

১২০- ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি টানা ১২০ ইনিংসে শূন্যবিহীন ছিলেন দ্য ওয়ালখ্যাত ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সময়ে এই রেকর্ড গড়েন তিনি। একশর বেশি ওয়ানডে শূন্যবিহীন থাকা বাকি দুজন হলেন নিউজিল্যান্ডের মার্টিন ক্রো (১১৯) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপলার ওয়েসেলস (১০৫)।

এর মধ্যে আবার কেপলার নিজের ১০৫ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে একবারও শূন্য রানে আউট হননি। বর্তমান সময়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ শূন্যবিহীন থাকার তালিকায় আছেন জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা (৮৩), পাকিস্তান সরফরাজ আহমেদ (৭৭) এবং ডেভিড ওয়ার্নার (৭৫)।

টেস্ট ক্রিকেটে শুধুমাত্র একজন ব্যাটসম্যানের রয়েছে ১০০’র বেশি ইনিংস শূন্যবিহীন থাকার রেকর্ড। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে ১১৯ ইনিংসে শূন্য রানে আউট হননি ইংল্যান্ডের ডেভিড গাওয়ার। এছাড়া রিচি রিচার্ডসন ৯৬ এবং অবসরের আগের ৯১ ইনিংসে কোনো শূন্য নেই শচিন টেন্ডুলকারের।

১০৮- আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবার শূন্য রানে আউট হওয়ার ১০৮ ইনিংস খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস। তিনি ভেঙেছেন স্বদেশি এবি ডি ভিলিয়ার্সের রেকর্ড। যিনি ৭৮ ইনিংসের পর দেখা পেয়েছিলেন প্রথম শূন্যের।

শুধুমাত্র ওয়ানডে ক্রিকেটের বিবেচনায় প্রথম শূন্যের আগে সবচেয়ে বেশি ইনিংস খেলার রেকর্ড সাবেক শ্রীলঙ্কান কুমার ধর্মসেনার। তিনি ৭২ ইনিংস খেলেছেন প্রথম শূন্যের আগে। শুধু টেস্টে এই রেকর্ড ইংল্যান্ডের জিমি অ্যান্ডারসনের দখলে। তিনি ৫৪ ইনিংস খেলার পর পান প্রথম শূন্যের দেখা।

১- প্রথম বলেই আউট হওয়াকে ক্রিকেটে বলা হয় গোল্ডেন ডাক। ওয়ানডে ক্রিকেটে একই ম্যাচের দুই অধিনায়কের গোল্ডেন ডাকের রেকর্ড রয়েছে মাত্র ১টি। ২০১৮ সালে বিশাখাপত্তমে ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক কাইরন পোলার্ড- দুইজনই সাজঘরে ফিরেছিলেন প্রথম বলে।

টেস্ট ক্রিকেটে একই ম্যাচে দুই অধিনায়কের গোল্ডেন ডাকের রেকর্ড নেই। তবে দুই অধিনায়কের পেয়ারের (দুই ইনিংসেই ডাক) রেকর্ড আছে একটি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেঞ্চুরিয়ন টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস এবং পাকিস্তানের অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ দুই ইনিংসেই আউট হন শূন্য রানে।

১০৪- টেস্ট ক্রিকেটে ১০৪ জন ব্যাটসম্যানকে শূন্য রানে আউট করেছেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা। ওয়ানডেতে এই রেকর্ড পাকিস্তানি কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরামের, তিনি খালি হাতে সাজঘরে পাঠিয়েছেন ১১০ জনকে।

কোন নির্দিষ্ট ব্যাটসম্যানকে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট করার রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি কোর্টনি ওয়ালশের। টেস্টে অস্ট্রেলিয়ান উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ইয়ান হিলিকে ৫ বার শূন্য রানে ফিরিয়েছেন ওয়ালশ। আর ওয়ানডেতে হার্শেল গিবস ও স্টিফেন ফ্লেমিংকে ৪ বার করে শূন্য রানে আউট করেছেন শ্রীলঙ্কার পেসার চামিন্দা ভাস।

২- টেস্ট এবং ওয়ানডে- দুই অভিষেকেই প্রথম বলে শূন্য রানে আউট হওয়া ক্রিকেটার মাত্র ২ জন। তারা হলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের চ্যাডউইক ওয়ালটন।

ওয়ানডেতে অভিষেক ম্যাচে গোল্ডেন ডাক করেও সফল হওয়া ব্যাটসম্যানদের মধ্যে রয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, শোয়েব মালিক, সুরেশ রায়নারা। এই ফরম্যাটে নিজের প্রথম দুই ম্যাচে শূন্য করেও সফল ক্যারিয়ারের দেখা পেয়েছেন শচিন টেন্ডুলকার, কেন উইলিয়ামসনরা।

তথ্যসূত্র: ইএসপিএনক্রিকইনফো