করোনাভাইরাসের এ সময়ে বাজারে সবজির দাম না বাড়লেও চাল, ডাল ও আটার দাম বেড়েছে। এতে সবজির দাম নিয়ে মোটামুটি স্বস্তিতে আছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। তবে চাল, ডাল ও আটার দাম বাড়ায় ক্রেতাদের মাঝে অস্বস্তি দেখা গেছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রামপুরা, খিলগাঁও, মালিবাগ অঞ্চলের বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

ক্রেতারা বলছেন, ‘দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা চাল, ডালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের উচিত এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।’

বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম স্থির থাকলেও মসুর ডালের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে খোলা আটার দাম।

ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য মতে, গত সপ্তাহে ২৮ থেকে ৩২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া খোলা আটার দাম বেড়ে হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। মাঝারি দানার মসুর ডাল গত সপ্তাহে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা বিক্রি হয়েছিল, তা এখন বেড়ে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি হয়েছে।

বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। আর ছোট দানার মসুরের ডালের দাম বেড়ে হয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে।

হঠাৎ করে মসুর ডাল ও আটার দাম বাড়ার কারণ হিসেবে হাজীপাড়ার ব্যবসায়ী জহিরুল বলেন, ‘পাইকারিতে ডাল ও আটার দাম বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে কমেছে সরবরাহ। বাড়তি দামে কেনার কারণে আমরাও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’

এদিকে, চালের বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- মিনিকেট ও নাজিরশাইল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা, পাইজাম ও লতা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি এবং স্বর্ণ ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম নতুন করে বাড়েনি। তবে করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পরপরই চালের দাম বেড়েছিল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে মিনিকেট ও নাজিরশাইল ৫৪ থেকে ৫৮ টাকা, পাইজাম ও লতা ৪২ থেকে ৪৮ টাকা এবং স্বর্ণা ৩২ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

চালের দামের বিষয়ে রামপুরার ব্যবসায়ী শামছু বলেন, ‘চালের দাম এখন নতুন করে আর বাড়ছে না। যা বাড়ার আগেই বেড়ে গেছে। তবে এখন চালের সরবরাহ কম। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর চাল পাওয়াই যাচ্ছে না।’

চাল-ডালের দামের বিষয়ে রামপুরার বাসিন্দা আকলিমা বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, খাদ্যপণ্যের ঘাটতি নেই। কিন্তু বাজারে তো একের পর এক পণ্যের দাম বেড়েই যাচ্ছে। আগে চালের দাম বাড়ল। আর এখন নীরবে ডালের দাম বাড়ছে। এভাবে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের অনেক কষ্ট হয়। সরকারের উচিত এই মুহূর্তে যারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়।’

রিকশাচালক মিলন বলেন, ‘এখন রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামলেও আয় তেমন হয় না। যা ভাড়া মারি তার প্রায় সবই গ্যারেজে জমা দিতে হয়। অল্প কিছু টাকা হাতে থাকে। এই চাল, ডালের যে দাম এই টাকা দিয়ে তিন বেলা কিনে খাওয়া সম্ভব না। করোনাভাইরাসের কারণে আমরা খুব কষ্টে আছি। এ সময় চাল, ডালের দাম কম থাকলে পরিবার নিয়ে দু’মুঠো খেতে পারতাম।’

চাল, ডালের দামে অস্বস্তি থাকলেও করোনা আতঙ্কের মধ্যে সবজির দাম নতুন করে বাড়েনি। তবে বাজারে নতুন আসা সজনের ডাটা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে। অবশ্য এই সবজিটি বাদে বাকিগুলো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে।

করলা ৪০-৫০ টাকা, বরবটি ৪০-৫০ টাকা, শসা ২০-৩০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা, পাকা টমেটো ২০-৪০ টাকা, শিম ২০-৪০ টাকা, গাজর ২০-৩০ টাকা, মুলা ১৫-২০ টাকা, বেগুন ২০-৪০ টাকা, পটল ৪০-৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এ সব সবজি এমন দামেই বিক্রি হচ্ছে।

তবে কিছুটা দাম কমেছে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের। ১৫-২০ টাকা পোয়া (২৫০ গ্রাম) বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকায়। অবশ্য রসুন ও আদার দামে এখনও বেশ চড়া। আমদানি করা রসুন ১৭০-১৮০ এবং দেশি রসুন ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর আদার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকা।

সবজির পাশাপাশি কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামে। ১২০-এ উঠে যাওয়া ডিমের ডজন এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। আর ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৫ টাকায়। তবে খামারে ডিম ও মুরগির দাম অনেক কম।

মালিবাগের ব্যবসায়ী কামাল বলেন, ‘সবজির গাড়ি এখন অনেক কম আসছে। তারপরও বাজারে সবজির ঘাটতি নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে সবজির দাম এখন আরও অনেক কম হতো। ক্ষেতে অনেক চাষির সবজি নষ্ট হচ্ছে। দাম না পাওয়ায় কেউ কেউ সবজি তুলছেন না।’

মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০-৫০০ টাকায়। নলা (ছোট রুই) মাছ ১৬০-১৮০ টাকা কেজি। তেলাপিয়া ১৩০-১৭০ টাকা, পাঙাশ ১৪০-১৮০ টাকা, শিং ৩০০-৪৫০ টাকা, শোল মাছ ৪০০-৭৫০ টাকা, পাবদা ৪৫০-৬০০ টাকা, বোয়াল ৫০০-৮০০ টাকা, টেংরা ৪৫০-৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। করোনা আতঙ্কের মধ্যে মাছের দামে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

খিলগাঁওয়ারে বাসিন্দা আরিফুল বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে এখন সবাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম বাড়ায় আরও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে এখন চাল ও ডালের যে দাম, তা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। সংশ্লিষ্টদের উচিত চাল ও ডালের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। যারা এই সময়ে দাম বাড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা করতে পারলে দেখবেন সবকিছুর দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’