যুগে যুগে কবিরা নিজেদের মহাকালের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কেউ প্রেমের কবি, কেউ দ্রোহের কবি হয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন মহাকালে।

সময়ের চাহিদা যিনি মিটিয়েছেন, সময় তাকে অনন্তকালের মর্যাদা দিয়েছে। যুগে যুগে কবিরা ফিরে এসেছেন বিদ্রোহ আর প্রতিবাদ প্রকাশের জন্য কবিতাকে হাতিয়ার করে।

শোষণ আর অন্যায়ের কন্ঠস্বর হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ের চাহিদা মেটাতে একজন কবি এসেছেন। যার কবিতায় প্রতিবাদের মশাল হয়ে জ্বলে উঠেছে ভারতে, জ্বলে উঠেছে যেন সারা বিশ্বেই।

কবির নাম আমির আজিজ। ১৯৯০ সালে ভারতের বিহারের পাটনায় জন্মেছিলেন আমির আজিজ। পাটনার গ্রামাঞ্চলে জন্ম নেয়া আমির নিজ যোগ্যতায় ভর্তি হয়েছিলেন ভারতের জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পাওয়া ছেলেকে নিয়ে পরিবারের স্বপ্ন ছিলো।

সবাই ভেবেছিলেন পড়াশোনা করে চাকরি করবেন, পরিবারের হাল ধরবেন। কিন্তু শোষণ আর অবজ্ঞায় বেড়ে ওঠা আমিরের স্বপ্নে সেসব কিছুই ছিলো না। ছিলো মানুষের মুক্তি। চারপাশে এত কিছু ঘটে চলছে! এর মাঝেও যে কবিকে বিষয় খুঁজে মরতে হয়, আমির তেমন কবি নন। নিজের আবেগ প্রকাশ করতে তাকে পোষ্য কোনো উপমার কাছে মাথা নত করতে হয় না।

আমির কবিতা লিখা শুরু করেছিলেন অনেক আগে থেকেই। তবে বিখ্যাত হয়েছেন অল্প ক’দিন আগে। গত ডিসেম্বরে নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতে জোর করেই পাশ করলো ‘সিটিজেনশিপ অ্যামান্ডমেন্ট অ্যাক্ট’। যার মানে হলো মুসলমান ছাড়া প্রতিবেশি তিন দেশ থেকে বাকি সব ধর্মের মানুষকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে ভারতে। এ আইনের জেরে বিক্ষোভে ফুঁসে উঠলো গোটা ভারত, রাজপথে নামলো মানুষের ঢল।

এর প্রতিবাদে আমির লিখলেন, ‘সাব কুছ ইয়াদ রাখা যায়ে গা…’। এই কবিতা তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে। দশজনের চোখে পরিচিত করে তুলেছে। তার প্রতিবাদী ভাষা মুগ্ধ করে দিয়েছে বিপ্লব আর বিদ্রোহীদের।

জানুয়ারির মাঝামাঝিতে লেখা হয়ে গেল কবিতাটা, ‘সাব কুছ ইয়াদ রাখা যায়ে গা’ যেটার শিরোনাম। শুনে চমকে উঠলো মানুষ, উপমাবিহীন এমন নির্জলা সত্য বহুদিন কারো কবিতায় শোনা হয়নি।

এই কবিতা আন্দোলনরত ভারতের প্রতিবাদমূখর ছাত্র-জনতাকে মুক্তির জন্য আরো আগ্রহী করে তুললো। সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্য কবিতাটি ভারতের সীমান্ত ছাড়িয়ে আছড়ে পড়লো বিদেশের মাটিতেও।

একই সপ্তাহে লন্ডনে জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জের মুক্তির দাবীতে সমবেত হয়েছিলেন একঝাঁক মানুষ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব রক ব্যান্ডের ধরণ বদলে দেয়া কালজয়ী ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের প্রতিষ্ঠাতা গিটারিস্ট রজার ওয়েটার। রক ব্যান্ড দিয়ে শোষণ আর অনাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বসঙ্গীতের মানচিত্রে অন্যরকম একটি স্থান করে নিয়েছিলো পিংক ফ্লয়েড।

সেই রজার লন্ডনে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে আবৃতি করলেন আমির আজিজের লেখা, ‘সাব কুছ ইয়াদ রাখা যায়ে গা’ কবিতার কয়েকটি লাইন। রজার কবিতাটি আবৃত্তি করলেন ইংরেজি ভাষায়।

কবির প্রশংসা করতেও ভুললেন না তিনি। বললেন, ‘আমির আজিজ, আমার কাছে মনে হয় এই ছেলেটাই আমাদের ভবিষ্যত!’

এরইমধ্যে ইউটিউবে বেশ কয়েকটি ভিডিও আপ করা হয়েছে রজার ওয়েটারের সেই আবৃত্তির। পিংক ফ্লয়েডের ভক্তরা এই ভিডিওগুলোতে নিজেদের আবেগ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন আমির আজিজ ও তার কবিতা নিয়ে। অনেকে রজারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার কণ্ঠে মোদি বিরোধী কবিতাটি আবৃত্তি করার জন্য।