দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল-এ ইতিহাস গড়েছিলেন বক্সার মো. মোশারফ হোসেন। বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলেন এশিয়ান গেমসে প্রথম পদক। ইতিহাস গড়া ভেন্যু সিউলকে হৃদয়ে ধারণ ও ঠোঁটের আগায় রাখতেই প্রথম সন্তানের ডাকনাম রেখেছিলেন সিউল (মাহবুব হোসেন সিউল)।

বুকভরা আশা ছিল যখনই ছেলের মুখ দেখবেন, সিউল নাম ধরে ডাকবেন, তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠবে ১৯৮৬ সালে এশিয়ান গেমেসে ব্রোঞ্জজয়ের সুখস্মৃতি।

কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। ছেলের মুখের দিকে তাকাতেই পারছেন না বাবা; তাকালেই রাজ্যের সব হতাশা ভর করে ১৯৮৫ সালে এসএ (সাফ) গেমসে স্বর্ণ আর পরের বছর এশিয়াডে ব্রোঞ্জজয়ী বক্সার মো. মোশারফের চোখেমুখে।

১৯৮৬ সালের অক্টোবরে পদক জিতে বীরের মতো দেশে ফেরার ৯ মাস পর প্রথম সন্তানের বাবা হয়েছিলেন মোশারফ; কিন্তু মাত্র এক বছর পরিবারে হাসির ফোয়ারা ছিল শিশুপুত্র মাহবুব হোসেন সিউলকে নিয়ে। এরপর প্রচন্ড ডায়রিয়া থেকে আস্তে আস্তে প্রতিবন্ধী হয়ে যায় ছেলেটি।

এখন হুইলচেয়ারেই কাটছে তার জীবন। হুইলচেয়ারই তার সবকিছু। ৩৩ বছর বয়সী যে ছেলের এখন টগবগে জীবন থাকার কথা, সেই সিউল এখন বাবার সামনে হুইলচেয়ারের যাত্রী। পুত্র সিউলের করুণ মুখ দেখে দেখে ইতিহাস গড়া কোরিয়ার সিউল যেন অন্ধকারে চাপা পড়ে গেছে মোশারফের চোখের সামনে।

Mosharof

দুই কন্যার বড় মাহমুদা হোসেন তিন বছর আগে এমবিবিএস পাশ করে চাকরির অক্ষোয়। ছোট মেয়ে মাহফুজা হোসেন অনার্সে অধ্যায়নরত। রাজশাহী শহরের তালাইমারির পৈত্রিক বাড়িতেই মোশরাফের দিন কাটছিল স্ত্রী, দুই কন্যা আর প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে।

কিন্তু মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দুই বছর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন মোশারফ নিজেই। স্ট্রোক করে ঘরে পড়ে আছেন পক্ষাঘাত রোগী হয়ে। দুই বছরের তার কোনো খোঁজই রাখেননি কেউ। বুধবার রাজশাহীর তালাইমারির বাসা থেকে নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা বলছিলেন ৩৪ বছর আগে বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে এশিয়ান গেমসে পদক জেতা এই বক্সার।

জাতীয় অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতে রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসেই অসুস্থ হয়েছেন মোশারফ। ২০১৮ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশ যুব গেমসে মোশারফ ছিলেন বক্সিংয়ের রেফারি; কিন্তু ১১ মার্চ ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় তার। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এক সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে ঘরে ফিরলেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা এই ক্রীড়াবিদ। প্যারালাইজড (পক্ষাঘাত) হয়ে এখন লাঠিভর দিয়ে বাসায় থাকছেন তিনি।

মোশারফের স্ত্রী হুনুফা হোসেনও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ২০০৮ সালে তিনিও একবার স্ট্রোক করেছিলেন। তবে তাদের ভাগ্য ভালো, হুনুফা হোসেন অচল হননি। তা নাহলে প্রতিবন্ধী ছেলে ও প্যারালাইসিস রোগী স্বামীর গোসল আর খাওয়া-দাওয়াসহ সবকিছু কে সামলাতেন?

সংসারে আয় রোজগারের মতো এখন কেউ নেই। মেয়ে ডাক্তারি পাশ করলেও চাকরি পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গিয়ে পেনশন পাওয়া ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকার সঙ্গে আরো লাখ চারেক যোগ করে মোশারফ ঢেলেছেন নিজের চিকিৎসায়।

৫৯ বছর বয়সী মোশারফ হোসেন জীবনে চারটি ঘটনা দাগ কাটার মতো। দুটি আনন্দের (পদক জয় ও প্রথম বাবা হওয়া), দুটি দুঃখের (ছেলের প্রতিবন্ধী ও নিজের পঙ্গু হওয়া)। তো কোনটি আগে বলবেন তিনি?

Mosharof

শুরু করলেন নিজের অসুস্থ হওয়ার পরের দুঃখগুলো দিয়েই ‘স্ট্রোক করার পর এখন পর্যন্ত কেউ আমার খোঁজ নেননি। বক্সিং ফেডারেশন, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কেউ না। চার আনা পয়সা দিয়েও আমাকে কেউ সাহায্য করেনি। অথচ আমার মনে পড়ে, যেদিন পদক নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ফিরেছিলাম। বিমান বন্দরে আমার গলায় ফুলের মালা ধরছিল না। আমি দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছিলাম; কিন্তু আমার খোঁজ কেউ রাখেননি।’

দুই বছর ধরে অসুস্থ হয়ে আছেন। নিয়মিত চিকিৎসা নিতে তো অনেক অর্থ চলে গেছে তাই না? ‘আমি যে সাতদিন সিএমএইচ এ চিকিৎসা নিয়েছিলাম তা ছিল ফ্রি। হাসপাতালে কেউ দেখতেও আসেননি। আমার মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনরা ঢাকা থেকে রাজশাহী নিয়ে আসে। অষ্টম দিন থেকেই নিজের টাকা দিয়ে চলছে চিকিৎসা। আটদিন পরপর থেরাপি। প্রতিবার দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চলে যায়। এর বাইরে সিটিস্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা, ওষুধ মিলিয়ে আমার ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা চলে গেছে। ইচ্ছে ছিল ভারতের কোনো ডাক্তার দেখানোর। গত বছর ঢাকার অ্যাপোলো (বর্তমান নাম এভারকেয়ার) হাসপাতালে ভারতের একজন ডাক্তার এসেছিলেন। আমি দেখাতে গিয়েছিলাম। তাতে ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমি কারো সাহায্য চাইনি; কিন্তু কেউ খোঁজই নিলো না, সেটাই কষ্টের’- বলছিলেন এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জেতা মো. মোশারফ হোসেন।

পদক জয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের কথা একটু শুনতে চাই। স্মৃতির পাতা উল্টালেন মোশারফ হোসেন, ‘৮১ কেজি লাইট হেভিওয়েটে নেপালের প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাত্র ৩৮ সেকেন্ডে নকআউট করে সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত করেছিলাম। এশিয়ান পর্যায়ে এত কম সময়ে প্রতিপক্ষকে কেউ কখনো নকআউট করতে পারেননি। সেমিফাইনালে আমার প্রতিপক্ষ ছিলেন পাকিস্তানের সৈয়দ হুসাইন শাহ। তিনি অনেক বড় বক্সার। গেমসে রৌপ্য জিতেছিলেন। অলিম্পিকেও তার পদক আছে। পদক আছে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপেও। আমি হুসাইন শাহ’র কাছে পয়েন্টে হেরে যাই।’

Mosharrof

এশিয়ান গেমসে যাওয়ার আগের বছরই মো. মোশারফ হোসেন ঢাকা সাফ গেমসে (বর্তমানে এসএ গেমস) স্বর্ণ জিতেছিলেন। আরো দুটি দক্ষিণ এশীয় গেমসে (৮৭, ৮৯) অংশ নিয়ে পেয়েছিলেন ব্রোঞ্জ পদক। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত পদক পেয়েছে একটি স্বর্ণসহ ১২টি। এর মধ্যে ১১টিই দলীয় ইভেন্টে। প্রথম পদকজয়ী মোশারফ হোসের পদকটিই শুধু একক প্রচেষ্টায়।

এশিয়াডের একমাত্র স্বর্ণ ক্রিকেটে। ২০১০ সালে গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে এসেছিল অধরা স্বর্ণ। ওই আসরেই নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশ পেয়েছিল রৌপ্য। ২০১৪ সালে ইনচন এশিয়ান গেমসে পুরুষ ক্রিকেটে ব্রোঞ্জ ও নারী ক্রিকেট রৌপ্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। বাকি ৭ পদক কাবাডিতে। যার মধ্যে তিনটি রৌপ্য ও চারটি ব্রোঞ্জ।

বর্তমানে ক্রীড়াবিদরা সাফল্য আনলে অনেক কিছু পান। খবরে সেগুলো দেখেন মোশারফ। আর ভাবেন তার খোঁজও কেউ নেন না, ‘এখন তো দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণ পেলে সরকার ফ্ল্যাট দিয়ে দিচ্ছে। অথচ আমার পাওয়ার মধ্যে ১৯৯৯ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের একটি স্বর্ণপদক ও ২৫ হাজার টাকা। সহায়তা বড় কথা নয়, আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট কেউ খোঁজই নিলেন না।’