স্টাফ রিপোর্টার : এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হবার পর তা কিছু গণমাধ্যম সংবাদ আকারেও প্রচার করে। বিষয়টি দারুণভাবে নাড়া দেয় সাভারের স্থানীয় প্রশাসন ও জন প্রতিনিধিদের। আর সে কারণেই ঐ নারীকে সহায়তার জন্য ছুটে যান অনেকে।

ঘটনাক্রমে জানা যায়, মঙ্গলবার ব্যাংক কলোনি মহল্লার এক যুবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই নারীর চুল বিক্রি করে বাচ্চার দুধ জোগাড়ের কথা ফেসবুক স্ট্যাটাস পোষ্ট করার পর হইচই পড়ে যায়। রাতেই জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, সমাজকর্মীসহ অনেকে ত্রাণ নিয়ে তার বাড়িতে ছুটে যান। বুধবার সকালে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন ঘটনাটি তদন্তে নামে। তদন্ত শেষে আজ বুধবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান জানান, ওই মহিলা সাথী বেগম দিনমজুরের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী। দেশে করোনা ভাইরাস দেখা দেয়ার দেড় মাস আগে তার মাথার চুল বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া তিনি তার অভাবের কথা স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা কারো কাছেই আগে জানান নি।

জানা গেছে, পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি জিমের গলির ৫৭/ এ /১ নান্নু মিয়ার টিনের বাড়ির একটি কক্ষে দুইমাস আগে পরিবার নিয়ে উঠেন মাটি কাটার শ্রমিক মো. মানিক। বিদ্যুৎ, গ্যাস বিলসহ মাসিক ভাড়া ২৩০০ টাকা। মানিকের সংসারে স্ত্রী সাথী, দুই পুত্র জুনায়েদ (৫) ও জুবায়ের (১৮ মাস)। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার সেকেন্দারনগর। ওই বাড়ি মালিক নান্নু থাকেন কেরানীগঞ্জে।

গৃহবধূর স্বামী মানিক জানান, গ্রামে তিনি মাটিকাটার কাজ করতেন। সেখানে কাজ না থাকায় দুইমাস আগে পরিবার নিয়ে তিনি সাভারে এসে ওই বাড়িতে উঠেন। প্রতিদিন সকালে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে সিটি সেন্টারের সামনে অন্য শ্রমিকদের সাথে তিনি কাজের খোঁজে যেতেন। কিন্তু কাজ না থাকায় তার পরিবারে অভাব দেখা দেয়। এ অবস্থায় সন্তানদের খাবারের টাকার যোগাড়ের কোনো উপায় না পেয়ে তার স্ত্রী দেড় মাস আগে এক ফেরিওয়ালার কাছে ১৮০ টাকায় মাথার চুল কেটে বিক্রি করেন। এরপর নিত্যপণ্য ক্রয় করেন।

এদিকে ওই বাড়ির এক রুমের ভাড়াটে মুইফুল বেগম পাশের এক বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। তিনদিন আগে মুইফুল তার গৃহকত্রীকে কথা প্রসঙ্গে সাথীর চুল বিক্রির কথা জানান। ওই গৃহকত্রী তার ভাইকে এ কথা জানান। এরপর ওই যুবক মঙ্গলবার ‘বাচ্চাদের দুধের টাকার জোগাড় করতে চুল বিক্রি করলেন এক নারী’ লিখে তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এরপর হইচই শুরু হয়। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলুসহ নিত্যপণ্য নিয়ে ওই বাড়িতে ছুটে যান। দেয়া হয় নগদ অর্থও।

সাথী জানান, তিনি অভাবের জন্য সাহায্যের খোঁজে কারো কাছে যাননি। চুল বিক্রির কথাও আগ বাড়িয়ে তিনি কাউকে বলেননি। পাশের রুমের ‘খালা’ এসব প্রচার করেছেন। অবশ্য মুইফুল বেগম দাবি করেছেন, তিনি এতো কিছু বুঝে কথাগুলো বলেননি।

অন্যদিকে এ খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হলে সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পৌর মেয়রসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই সত্যতা যাচাই করতে সেখানে ছুটে যান। অবশেষে খোলাসা হয় দেড় মাস আগের চুল বিক্রি রহস্য।

সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজুর রহমান জানান, ঘটনাটি আমরা তদন্ত করেছি। করোনা সংকটে অতিরঞ্জিত করে ঘটনা প্রচার করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, তদন্তে এটা স্পষ্ট যে করোনা কালীন দুর্যোগের জন্য অর্থকষ্টে তিনি চুল বিক্রি করেননি। দেড় মাস আগে তিনি তার চুল কেটে ফেলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে এই পরিবারকে।

সাভার পৌর মেয়র আব্দুল গণি বলেছেন, পুরো ঘটনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ওই মহিলা কারো কাছে ত্রাণের জন্য যাননি। সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভাবের তাড়নায় চুল বিক্রির খবরটি দেখার পর আমি তার বাসায় যাই এবং ১৫ দিনের চাল, ডালসহ খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ প্রদান করি।

ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী বলেছেন, শুরুতেই ঘটনাটি ষড়যন্ত্র এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে। তিনি সেখানে গিয়ে জানতে পারেন দেড় মাস আগের ঘটনা।