মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শোকাহত পুরো আওয়ামী লীগ পরিবার। তার প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সহকর্মী, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও। স্মৃতিচারণ করেছেন তাদের অনেকেই। এই মুহূর্তে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন হাসপাতালে। প্রত্যেকেই মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে কাটানো সময় নিয়ে স্মৃতিকাতর হওয়ার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে।

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘বাবার (জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী) মতোই মোহাম্মদ নাসিম আমৃত্যু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সব ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন দেশপ্রেমিক ও জনমানুষের নেতাকে হারালো। আমি হারালাম একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে।’ প্রধানমন্ত্রী তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

আওয়ামী  লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক ভিডিও বার্তায় মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন দলের দুঃসময়ের সাহসী কর্মী। ছিলেন একজন বলিষ্ঠ সংগঠক। তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো।’

জানতে চাইলে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে শোকাহত। একজন গর্বিত ও সাহসী রাজনীতিবিদ এবং দেশ অন্তপ্রাণ পরিবারের একজন সদস্য হারালো বাংলাদেশ। তিনি সব সময় জনগণের কথা বলেছেন। তার মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।  তার প্রয়াণে সাহসী চিন্তার অভাব অনুভব করবো। আওয়ামী লীগ শুধু একজন নেতাই নয়, হারিয়েছে সাহসী একজন সংগঠককে। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। মৃত্যুকালেও তিনি যুদ্ধ করে সেটা প্রমাণ করেছেন।’

ফারুক খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর মোহাম্মদ নাসিমের কাছে রাজনৈতিক পরামর্শ ও জ্ঞান নিতাম। তার নেতৃত্বে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। তিনি ওপারে ভালো থাকুন।’

জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম আজীবন জাতির জনকের আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অটল ছিলেন।’

২০১৪-২০১৮ মেয়াদে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ নাসিমের দায়িত্ব পালনের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘মোহাম্মদ নাসিমের বর্ণাঢ্য ও কর্মময় রাজনৈতিক জীবন এদেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন তুলে ধরেছেন এদেশের রাজনীতি, উন্নয়ন এবং জনকল্যাণে মোহাম্মদ নাসিমের অবদানের কথা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ একজন জনদরদি ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হারালো। তিনি মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। আমৃত্যু এদেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন। এদেশের গণতন্ত্র বিকাশে মোহাম্মদ নাসিমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে যেমন তিনি সংগ্রাম করেছেন। তেমনি বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনের হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে রাজপথে ছিলেন সাহসী কণ্ঠ। তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে তিনি পুলিশের নিষ্ঠুর পিটুনির শিকার হয়েছিলেন। জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে আনতে দেশ ও জাতি তার অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।’

আজ শনিবার (১৩ জুন) বেলা সোয়া ১১টার দিকে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ নাসিমকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তার ছেলে তানভীর শাকিল জয় এবং বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী আল ইমরান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন।

প্রসঙ্গত, গত ১ জুন নিউমোনিয়াজনিত সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন সিরাজগঞ্জ-১ সংসদীয় আসন (কাজীপুর) থেকে পাঁচবার বিজয়ী সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করা হলে ফলাফল পজিটিভ আসে। তবে সম্প্রতি মোহাম্মদ নাসিমের পরপর তিনটি করোনা টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৫ জুন শুক্রবার ভোরে তার স্ট্রোক হয়। সেদিনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাজিউল হকের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার হয়। এর আগেও তার একবার স্ট্রোক হয়েছিল। সব মিলিয়ে তার অবস্থা খুব সংকটাপন্ন ছিল বলে জানান চিকিৎসকরা।