করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ সারাদেশের বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায় তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেতন দিলেও বেশিরভাগ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাননি। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ নির্দেশনায় আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত এ মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। জানা গেছে,  দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আদায়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। এসময় নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনও আয় না থাকায় ফেব্রুয়ারি থেকেই তাদের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, ‘নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করোনার আগেই ঠিকমতো বেতন দিতে পারেনি। আর এখন করোনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনও আয় নেই। ফলে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের আয় থাকলেও তারা বেতন-ভাতা দিচ্ছে না, এমন অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে তা খুবই দুঃখজনক।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশের কিন্ডার গার্টেনের  ছয় লাখ শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন না গত এপ্রিল থেকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মার্চ মাসে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী টিউশন ফি দিয়েছে। এরপর থেকে কোনও টিউশন ফি আদায় করা সম্ভব হয়নি। অভিভাবকদের কাছে টিউশন ফি চাওয়া হলেও তারা দিচ্ছেন না। ফলে সারাদেশের ছয় লাখ শিক্ষক এপ্রিল মাস থেকে বেতন পাচ্ছে না। বেতন দিতে না পেরে অনেক কিন্ডার গার্টেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা হাই স্কুল, ন্যাশনাল আইডিয়াল, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজসহ এমপিওভুক্ত বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষকদের গত মার্চ থেকে বেতন দেওয়া হয়নি। এছাড়া, রাজধানীর নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনা পরিস্থিতির আগে বছরে দুইবার অল্প পরিমাণ অর্থ দেওয়া হলেও গত ফেব্রুয়ারি থেকে কোনও বেতন বা নগদ অর্থ দেওয়া হয়নি।

সদ্য এমপিওভুক্ত রাজধানীর লায়ন্স অগ্রণী বিদ্যা নিকেতন জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনও বেতন দেয়নি। নামিদামি কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের অবস্থা একই রকম। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে রাজধানীসহ সারাদেশের নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়।

হবিগঞ্জের এমপিওভুক্ত ফতেহপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কাদের তালুকদার বলেন, ‘করোনার সময় টিউশন ফি আদায় না হওয়ায় নন-এমপিও (খণ্ডকালীন) শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’ তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে শুধু আমার স্কুলই নয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষকরা বেতন না পেয়ে অত্যন্ত কষ্টে আছেন।’

ঠাকুরগাঁওয়ের নন-এমপিও কে বি এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ‘গ্রাম অঞ্চলের কোনও প্রতিষ্ঠানেই টিউশন ফি আদায় করা যাচ্ছে না। আমার প্রতিষ্ঠানে যারা লেখাপড়া করে তারা হতদরিদ্র। টিউশন ফি দেওয়ার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। পরীক্ষার সময় সামান্য কিছু অর্থ নেওয়া হতো। করোনার কারণে সেই সুযোগও থাকছে না। একারণে শিক্ষকরা এবছর একটি টাকাও পাবেন না। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’

জানতে চাইলে রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল জলিল মিয়া   বলেন, ‘মার্চ মাসে বেসিক বেতন দেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে এই কলেজের শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। টিউশন ফি আদায় করতে পারছি না, তাই বেতন দিতে পারছি না। ’

টিউশন ফি আদায় হলেও শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগের বিষয়ে উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘বেতনের কথা বলতে হলে আপনি সামনাসামনি আসবেন, আমি মোবাইলে কথা বলবো না।’

রাজধানীর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষক এবং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা গত মার্চ থেকে বেতন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করলেও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা তা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, পুরোটা না হলেও কিছু বেতন দেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নেতারা সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ জরুরিভিত্তিতে এমপিওভুক্তিরও দাবি জানানো হয়।

এদিকে সদ্য সরকারি হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষকদের এপ্রিল ও মে মাসের বেতন দিতে  গত ১৮ মে  শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে স্থায়ী আমানত ভেঙে হলেও বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক্ষক এবং নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও নির্দেশনা নেই। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হবে এমন শর্তে অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পায়। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের দায়-দায়িত্ব সরাসরি ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির। এক্ষেত্রে কমিটিও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন শিক্ষকরা।

অন্যদিকে অভিভাবকদের চাপ দিয়ে টিউশন ফি আদায় না করার জন্য গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড আহ্বান জানায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘কারোনার সময় চাপ দিয়ে টিউশন ফি আদায় না করার জন্য বলা হয়েছে। তবে সচ্ছল অভিভাবকদের কাছ থেকে টিউশন ফি না নিলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কীভাবে হবে? এই বিষয়টি সচ্ছল অভিভাবকদের ভাবা উচিত। কারণ, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপরেই চলে।’