বাংলাদেশে কৃষির উন্নয়নে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে দেশে খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক সংকট বা দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে। সে কারণে আগে থেকেই সজাগ রয়েছে সরকার।

কৃষির উন্নয়নে বর্তমানে আবাদী জমি ছাড়া অনাবাদি জমিও আবাদের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এছাড়া এক জমিতে বছরে চার ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দানাদার ফসল ছাড়াও ফলমূল, বাদাম, ডাল ও তেল জাতীয় শস্য, সবজি চাষ, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও মাছ চাষে উন্নত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও জেলা উপজেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফ্রি), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছে, করোনার প্রভাবে অনেক দেশেরই অর্থনীতিতে একটা সংকট আসতে পারে। এর প্রভাব খাদ্য উৎপাদনের ওপর পড়বে। খাদ্য সংকট হবে, এমনকি দুর্ভিক্ষও হতে পারে। এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কৃষি, ভূমি, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদসহ সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বার বার বলছেন, এক ইঞ্চি জমি পতিত রাখা যাবে না এবং খাদ্য, ফসল, সবজি ও ফলমূল উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে যেন উদ্বৃত্ত থাকে এভাবে চাষ করতে হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে অন্য দেশকে যেন সহযোগিতা করা যায় সে টার্গেট নিয়ে জমিতে ফসল ফলাতে হবে।

কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অভিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পতিত জমিসহ ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার, এক জমিতে চার ফসল উৎপাদন, দানাদার বিভিন্ন ফসল ছাড়াও ফলমূল, বাদাম, ডাল ও তেল জাতীয় শস্য, সবজি চাষ, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও মাছ চাষে প্রণোদনা, দেশকে ১৪টি কৃষি অঞ্চলে ভাগ করে ১৪ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব গ্রহণ, উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন, আউশ, আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এবং অন্য বছরের তুলনায় জমির পরিমাণ বাড়ানো, প্রচলিত ফসলের সাথে কাজু বাদাম, কফি, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত ফসলের চাষাবাদ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা, এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ করা, কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা, মোট আবাদী জমি ৮৫.৭৭ লাখ হেক্টরের সঙ্গে ১০ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার শতক অনাবাদি জমি যুক্ত করা, কৃষকদের বিভিন্ন পুরস্কারের মাধ্যমে মূল্যায়ন করাসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

Agri.jpg

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয় বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশকে ১৪টি অঞ্চলে ভাগ করে মন্ত্রণালয়ের ১৪ জন কর্মকর্তাকে এসব দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এছাড়া প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক এবং প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কৃষি কর্মকর্তা নিজ নিজ উপজেলায় কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতি এবং জমির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি-না সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক প্রতিনিয়ত জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত খবর রাখছেন।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক  বলেন, করোনার কারণে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলা করতে হলে উৎপাদন আরও অনেক বাড়াতে হবে। দেশে খাদ্য উৎপাদনে যে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে এবং উৎপাদনের যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি চলমান রয়েছে, সেখানে থেমে গেলে হবে না। সেজন্য তা আরও বেগবান ও ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আউশ ও আমনের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আউশের জন্য বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। আগামীর ফসল আমন ও রবি মৌসুমে বীজ, সার, সেচ প্রভৃতিতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সংকট তৈরি না হয় সেজন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ করার জন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি । এছাড়া কৃষক যেন লাভবান হয় সে জন্য যান্ত্রিকীকরণ করাসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন আবাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৯ লাখ হেক্টর ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৫৪ লাখ টন চাল। আমন উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কম ফলনশীল জাতের আবাদ কমিয়ে আধুনিক/উফশি জাতের সম্প্রসারণ ও হাইব্রিড জাতের এলাকা বৃদ্ধি করা হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেশকে ১৪টি অঞ্চলে ভাগ করে মন্ত্রণালয়ের যে ১৪ জন কর্মকর্তাকে এটি দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা হলেন- কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করবেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আশ্রাফ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকায় আরিফুর রহমান অপু, ময়মনসিংহে ড. আবদুর রৌফ, বগুড়ায় কমলারঞ্জন দাশ, দিনাজপুরে মাহবুবুল ইসলাম, রাজশাহীতে আবদুল কাদের, ফরিদপুরে হাসানুজ্জামান কল্লোল ও খুলনায় অতিরিক্ত সচিব বলাই কৃষ্ণ হাজরা। এছাড়া রংপুর অঞ্চলের দায়িত্ব পেয়েছেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান রেজাউল করিম, যশোরে যুগ্ম সচিব দেলোয়ার হোসেন, বরিশালে তাজকেরা বেগম, রাঙ্গামাটিতে জহুরুল হক, চট্টগ্রামে ড. হুমাইরা সুলতানা এবং সিলেট অঞ্চলের দায়িত্ব পেয়েছেন যুগ্ম সচিব এ টি এম সাইফুল ইসলাম।

পতিত জমি ব্যবহারের বিষয়ে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান  বলেন, ‘আমরা আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বলেছি, তারা যেন কোনো পতিত জমি না রাখেন, সেখানে যেন চাষাবাদের ব্যবস্থা করেন। সেখানে যেভাবে সম্ভব।’

Agri.jpg

তিনি বলেন, ‘জমির প্রকৃতি অনুযায়ী, কোথাও ধান আবাদ, কোথাও বাগান করা হবে, কোথাও ফলের গাছ লাগানো হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী  বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না বলেছেন, চাষাবাদ করতে হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারদের মৌখিক নির্দেশনা দেই, তাদের সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে। আমরা তাদের বলেছি, সমন্বিতভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বসে যেন তারা এ বিষয়ে প্রচারণা চালান।’

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) আরিফুর রহমান অপু  বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে যেন দেশে খাদ্য ঘাটতি না থাকে এবং সর্বোচ্চ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। আবাদী জমি ছাড়াও বাড়ির আঙিনা, আশপাশ ফল ও সবজি চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রীও বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কৃষিতে যন্ত্রের সার্বোচ্চ ব্যবহার, কৃষি প্রণোদনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার, পারিবারিক সবজি বাগান স্থাপন ও কৃষকের তালিকাসহ সব ধরনের কৃষি কার্যক্রম দেখভাল করতে বলা হয়েছে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভালো জাতের বীজ, সার ও কীটনাশক দিয়ে কৃষককে সহযোগিতা করছি, আমরা কাউকে নগদ টাকা দিই না।’