বলা যায়, তার হাত ধরেই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তি। তাকে বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা লাভের রুপকার ও নেপথ্য কারিগর বললেও অত্যুক্তি হবে না। বিশ বছর আগে বাংলাদেশ যখন আইসিসির সহযোগি সদস্য থেকে পূর্ণাঙ্গ সদস্য হয়, টেস্ট খেলিয়ে দেশের মর্যাদা পায়- তখন যিনি ছিলেন বিসিবি সভাপতি সেই অন্তঃপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক ও ক্রিকেটপ্রেমী সাবের হোসেন চৌধুরী মনে করেন, আসলে এ দীর্ঘসময়ে দেশের ক্রিকেটে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

২০০০ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২০ সালের ২৭ জুন, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে হিসেব করলে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ২০ বছর পূর্ণ হয়ে গেল মাত্র ২৪ ঘন্টা আগে। এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট মাঠে ও মাঠের বাইরে কতটা এগিয়েছে?- তা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সবখানে।

এ দীর্ঘসময়ের পথচলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের কতটা উন্নতি ঘটেছে? মাঠ-মাঠের বাইরে ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড কেমন ছিল? সাফল্য-ব্যর্থতার পর্যালোচনা করলে চালচিত্র কী দাঁড়ায়?- এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিসিবির সাবেক প্রধান সাবের হোসেন চৌধুরীর মত, আসলে বাংলাদেশের ২০ বছরে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। সেই টেস্ট যাত্রা শুরু থেকে এ প্রায় দুই যুগে তেমন আগানো সম্ভব হয়নি। বরং পরিসংখ্যান ও রেটিং-র‌্যাঙ্কিং হিসেব কষে ব্যাখ্যা করলে, দেখা যাবে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। আগের চেয়ে বরং পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

শুক্রবার (২৬ জুন) ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদের ইউটিউব লাইভে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেকাল ও একাল নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী যা বলেছেন তার পরতে পরতে আসলে হতাশার চিত্র।

সঞ্চালক নোমান সাবের চৌধুরীর কাছে জানতে চান, এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আপনি কি সন্তুষ্ট? যে লক্ষ সামনে রেখে ২০ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ, তা কতটা পূরণ সম্ভব হয়েছে?

সাবের হোসেন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, ‘দেখেন এটাকে দুই ভাবে করা যায়। একটা হচ্ছে আমি আমার ব্যক্তিগত মতামত দেব, বিশ্লেষন করব। আমার মনে হয় সবার আগে পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো উচিৎ। কারণ আমি আমার মতামত ব্যক্ত করলাম, তা নিয়ে কোন কথা উঠতেই পারে। আরেকজন এসে বলল যে এটা ঠিক না। আমি যদি পরিসংখ্যান ঘেটে পরিসংখ্যানের আলোকে কোন কথা বলি তাহলে তো আর কথা ওঠার সুযোগ নেই। কারণ পরিসংখ্যান তো কোন মিথ্যা তথ্য দেবে না। যেটাই দেবে সঠিকভাবে দেবে।’

সাবের চৌধুরী যোগ করেন, ‘আপনি যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন আমরা ২০ বছরে ১১৯ টেস্ট খেলে জিতেছি মোটে ১৪টিতে। তার মানে বছরে একটি টেস্টও জেতা সম্ভব হয়নি, ৮৯ টেস্ট হেরেছি। আবার যদি ঐ ১৪ জয়ের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন সাতটিই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। বিশ্ব ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের অবস্থান তো এখন ভাল না। এখানে আমাদের অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের সাথে একটি করে টেস্ট জয় ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গেও চারটি টেস্ট জয় আছে। এছাড়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও জিতেছি আমরা। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এখনও টেস্ট জয় ধরা দেয়নি, গর্বেরও কিছু নেই।’

বিশ বছরকে অনেক দীর্ঘ সময় অভিহিক করেছেন বিসিবির সাবেক সভাপতি। তার মূল্যায়নে বোর্ডের অর্থ, আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা ও সার্বিক বিচার বিশ্লেষণে অগ্রগতির চেয়ে বরং অবনমনটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। তিনি পরিষ্কার বলে দেন, তারা যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন তখন বিসিবির অর্থনৈতিক ভীত ছিল রীতিমতো নড়বড়ে ও ভাঙাচোরা।

‘আমি সার্বিক অবস্থার আলোকে বিশ্লেষণ করলে বলব, আমরা মোটেই এগুতে পারিনি। এখন আমাদের প্রচুর অর্থ আছে। একসময় আমি, সৈয়দ আশরাফুল হক আর তানভির মাজহার তান্না আমরা যে আইসিসির সভায় যোগ দিতে যেতাম, বোর্ডের সেই বিমান ভাড়া বহনের সামর্থ্য ছিল না। আমরা ব্যক্তিগত খরচে গিয়েছি। আমরা অনেকেই নিজের পকেট থেকে খরচ করতাম। জাতীয় দলের অনেক ট্যুরে যাওয়ার আগে আমাদের অনেকের কাছে টিকিট চেয়ে তারপর ক্রিকেটারদের পাঠাতে হতো।’

‘আমি ঠিক জানি না, তবে এখন হয়তো আমাদের ৩০০-৪০০ কোটি টাকা আছে বোর্ডের। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের বাজেট জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়েও বেশি। সরকারি সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সবার অকুণ্ঠ সমর্থন আছে। আমি যে এখন মূল্যায়ন করব, তা কোন প্রেক্ষাপটে করব? এখন আমার আর কোন সীমাবদ্ধতা নেই। আমাদের কোচ নিয়োগ করতে হাজার কোটি টাকা খরচ করতেও বেগ পেতে হচ্ছে না।’

‘কাজেই ঐ ভাবে যদি আমি দেখি, তাহলে এখন চূড়ান্ত কথা কী দাড়াচ্ছে? এখন যদি একটা স্কোরকার্ড দেখি, বিশ বছর আগে যে জায়গায় যাত্রা শুরু করেছিলাম, এখনও ঠিক সে জায়গাতেই আছি। আপনি যদি কয়েকটি টেবিলের দিকে তাকান, আইসিসির একটি টেবিল আছে, সেখানে ৯টা দেশকে দেখাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ সবার নিচে। আমাদের নিচে আর কেউ নেই। আবার ক্রিকইনফোর টেবিলে যান তাহলে দেখবেন আফগানিস্তানও আমাদের ওপরে। অর্থাৎ যে দেশটি মাত্র তিন বছর আগে টেস্ট স্ট্যটাস পেল, যে দেশের জাতীয় পর্যায়ের কোন কিছুই ঠিক নেই। যারা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। সন্ত্রাসবাদ তাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সমস্যা। অর্থনৈতিক সমস্যা আর সুযোগ সুবিধার ঘাটতিও বেশ। তারপরও তিন বছরে মাথায় এসে বাংলাদেশের মাটিতে এসে তারা বাংলাদেশকে হারিয়ে দিল। পয়েন্টস টেবিলে আফগানিস্তানও বাংলাদেশের ওপরে চলে গেছে।’

‘আসলে যদি আমরা দেখি, অবস্থানের দিক থেকে একই জায়গায় আছি আমরা। এগিয়ে যাওয়ার বিবেচনা করে যদি দেখি তাহলে দেখব আমরা এগুনোর বদলে আরও পেছনে চলে গেছি। সেটাই উদ্বেগের বিষয়। আজকের এই শুভ দিনে (টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির বিশ বছর) এসব আমরা বলতে চাই না। এ দিন অনেক বড় অর্জনের। তবে বাস্তবতার কারণেই তা চলে আসে।’