আগামী সাড়ে ৩ বছরে দেশের নির্ধারিত ১০টি জেলায় ৬৩ হাজার টন দেশি প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জেলাগুলো হচ্ছে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, নড়াইল ও বাগেরহাট। এই ১০ জেলায় দেশি প্রজাতির মাছ ও শামুকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে এগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠীও তৈরি করা হবে। এর ফলে একদিকে নিরাপদ মাছের মৎস্য উৎপাদন বাড়বে, অপরদিকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাও বাড়বে। এ লক্ষ্যে সরকার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ অর্থের পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে মৎস্য অধিদফতর। চলতি বছর শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩০ জুন মেয়াদে শেষ করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকের সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া প্রকল্প প্রস্তাবনায় জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নতুন করে ১৬০টি মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে ২৪০টি মৎস্য অভয়াশ্রম। ৩৯২টি দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রদর্শনী খামার গড়ে তোলা হবে। ৩৯২টি স্থানভেদে লাগসই প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও ১৯৬টি বিল নার্সারি স্থাপন করা হবে। ২টি বাঁওড় ও ১১০টি বিল বা প্লাবন ভূমিতে দেশীয় প্রজাতির রুইমাছের পোনা ছাড়া হবে।

জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর জেলার সবকটি উপজেলা ও ফরিদপুর জেলার ২টি উপজেলা, বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার সকল উপজেলা, খুলনা বিভাগের নড়াইল জেলার সকল উপজেলা ও বাগেরহাট জেলার ২টি উপজেলা জুড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এলাকার ১১০টি ধানক্ষেতে পেনে মাছ চাষ প্রদর্শনী করা হবে। ১০০টি ইউনিট খাঁচায় মাছ চাষ করা হবে। ১৫টি শামুকের চাষ প্রদর্শনী করা হবে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবী ও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যে উদ্দেশে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে সরকার, সে কারণগুলো হচ্ছে প্রকল্প এলাকা গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা ভিত্তি বছর ২০১৭-১৮ এর উৎপাদন ৩ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা। দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩৯২টি দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ প্রদর্শনী ও ১৫টি শামুকের প্রদর্শনী স্থাপন করা। ১০০ ইউনিট খাঁচায় মাছ চাষ প্রদর্শনী করা। ১১০টি ধানক্ষেতে মাছ চাষ প্রদর্শনী ও ৩৯২টি পেনে মাছ চাষ প্রদর্শনী স্থাপন করা এবং মৎস্য খাতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এলাকার ১ লাখ ৮ হাজার ৮৪৭ জন সুফলভোগীর দক্ষতা উন্নয়ন।

প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ের উচ্চ প্রাধিকার তালিকায় এবং ২০২০-২১ অর্থ বছরের এডিপিতে বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় উত্তম মৎস্য চাষ অনুশীলন করে দেশি প্রজাতির মাছ ও শামুক উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। দেশি প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। ফলে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। এসব কারণেই প্রকল্পটি সরকারের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিলুপ্ত প্রায় মূল্যবান দেশীয় প্রজাতির মাছের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ মাছের উৎপাদন বাড়বে। যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় সহায়ক হবে। এতে দেশে আমিষের ঘাটতি যেমন পূরণ হবে, তেমনি কর্মস্থানের দুয়ার খুলবে। দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি বাড়বে। অর্থনীতি হবে শক্তিশালী। যা জিডিপিতে ভূমিকা রাখবে।