প্রাপ্যতার ভিত্তিতে তিন জন শিক্ষকের পদোন্নতির সুপারিশ করা হলেও ১১ বছর ধরে অধ্যক্ষ তা আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, একজন সিনিয়র শিক্ষককে পদোন্নতি না দেওয়ার চেষ্টায় সবার পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা কলেজের অধ্যক্ষ মোছা. জাকিফা খাতুন। তবে পূজার ছুটির পর বিষয়টি সমাধান করতে পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষকদের তালিকা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠাবেন বলে  জানিয়েছেন অভিযুক্ত অধ্যক্ষ।

দীর্ঘ ১১ বছর পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে অভিযোগ করেন কয়েকজন শিক্ষক। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রভাষক মো. মকবুল হোসেন, প্রভাষক মো. হোসেন আলী, অসীম কুমার দাস এবং মো. আশরাফুল ইসলাম।

অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ সালে ওই সময়ের গভর্নিং বডির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র পাল প্রাপ্যতা অনুসারে সিনিয়র শিক্ষকদের পদোন্নতির সুপারিশ করে রেজুলেশন করেন। কিন্তু অধ্যক্ষ শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে আঞ্চলিক পরিচালকের দফতরে পাঠাননি। নাটোর জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করেননি অধ্যক্ষ। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদন অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হলেও তা গোপন রাখেন তিনি।

পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কলেজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. মকবুল হোসেনকে বাদ দিতে অধ্যক্ষ পদোন্নতি আটকে রাখেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।

অভিযোগে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জ্যেষ্ঠতা নির্ণয়ের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে পাঠান। তবে পরে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন অভিযোগ করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বন্ধ রাখেন। বিষয়টি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর তদন্তও করে। ২০১১ সালের ১০ অক্টোবরের জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষকরা পদোন্নতি পাবেন। কিন্তু অধ্যক্ষের অসহযোগিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন বিগত ৯ বছরেও বাস্তবায়ন করেননি অধ্যক্ষ। ফলে মোট প্রায় ১১ বছর ধরে সহকারী অধ্যাপক পদ না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছেন তিন জন শিক্ষক। ইতোমধ্যে আরও দুই জন শিক্ষক পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তারাও পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।

জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা কলেজটি ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টির সময় এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন পদে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগকাল থেকে বিভিন্ন জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ব্যবস্থা একবারে ভেঙে পড়েছে, যা জেলা শিক্ষা অফিসার ও পরিচালকের পরিদর্শনে উঠে আসে। এর জন্য শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে দায়ী করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কোনও সহযোগিতা করেননি কলেজের অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২০ সালে ২ মার্চ শিক্ষা অফিসার জ‌্যেষ্ঠতা নির্ধারণের জন্য পত্র দিলে অনেকদিন পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির সময় কোনও প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কমিটির রেজুলেশনের মাধ্যমে চার জন শিক্ষকের নিয়োগপত্র পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ওই চার শিক্ষক মো. হোসেন আলী, মো. মকবুল হোসেন, অসীম কুমার দাস ও মো. আশরাফুল আলমকে চাকরি বৈধকরণের জন্য এবং অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগের জন্য ২০০০ সালের ২২ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই বছরের ১৭ জুলাই বৈধকরণ ও নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়।

তবে মো. আশরাফুল আলমের মাস্টার্সের ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় ফল প্রকাশের পর নিয়োগ বৈধকরণের শর্ত দেওয়া হয়। ফলে বৈধকরণ প্রার্থীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক থাকেন মো. হোসেন আলী, মো. মকবুল হোসেন, অসীম কুমার দাস। এই তিন জন যোগদান করেন ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০০ সালের ৩ জানুয়ারি নিয়োগ এবং ৪ জানুয়ারি যোগদান করা এই শিক্ষকদের বৈধ করা হয় ২০০০ সালের ১৭ জুলাই। বিধি অনুযায়ী এদিন থেকেই জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচিত হবে।

তবে প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ প্রসঙ্গে বলা হয়, এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে। তবে এমপিওভুক্তি একই দিন হলে যোগদানের তারিখ বিবেচনা করতে হবে। আর কোনও শিক্ষকের নিয়োগ নিয়মিত করা হলে নিয়োগের নিয়মিতকরণের তারিখই যোগদানের তারিখ হিসেবে গণ্য করে জ্যেষ্ঠতা গণনা হবে। আর যোগদানের তারিখ একই হলে, জন্ম তারিখ বিবেচনায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনের প্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নিশ্চিত করে বলা হয়, নিয়োগকালীন সময়ে মো. আশরাফুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এমএসসি ভূগোল ফলপ্রার্থী। কাজেই তিনি সহকারী অধ্যাপকের পদ দাবি করতে পারবেন না। অপরপক্ষে মো. হোসেন আলী, মো. মকবুল হোসেন ও অসীম কুমার দাসের যোগদান আগে হওয়ায় সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য হন তারা। শিক্ষকরা এই চার শিক্ষকের বৈধকরণসহ প্রভাষক পদে নতুন নিয়োগ দেন ওয়াহিদা খাতুন, মো. আবুল কালাম আজাদ ও মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে।

কলেজের শিক্ষকরা জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ৫:২ অনুপাতে এই কলেজের মোট ৫ জন প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন। নতুন করে প্রভাষক ওয়াহিদা খাতুন এবং আবুল কালাম আজাদ পদোন্নতির যোগ্য।

১১ বছর ধরে পদোন্নতি আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, আমি পদোন্নতির জন্য শিক্ষকদের তালিকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ওই শিক্ষকরা অভিযোগ করে তা বন্ধ করে দিয়েছেন।

কলেজ অধ্যক্ষ এই বক্তব্য দিলেও প্রভাষক মো. মকবুল হোসেন বলেন, ‘শিক্ষকরা কখনও কোনও অভিযোগ করেননি। তিন জন জ্যেষ্ঠ প্রভাষকের নাম বাদ দিয়ে ঊর্ধতন পর্যায়ে তালিকা পাঠানোর কারণে পদোন্নতি আটকে যায়। এই তিন জনের মধ্যে প্রভাষক আব্দুল করিম সরকার বঞ্চিত থেকেই ২০১৮ সালে অবসরে যান।’

অভিযোগের অন্য বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অধ্যক্ষ জাকিফা খাতুন সদুত্তর না দিয়ে পরে আবার কথা বলতে চেয়েছেন।