করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি না হলে আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে আয়োজক সংস্থা বাংলা একাডেমি। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতির যদি অবনতি হয় তাহলে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এই ‘যদিতে’ আপত্তি মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা সংস্থাগুলোর। প্রকাশনাগুলোর দাবি, মেলা হবে নাকি মেলা হবে না যে কোনও একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলা একাডেমিকে। মাঝামাঝি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অর্থলগ্নির বিষয় আছে।

বাংলা একাডেমির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে করোনার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ যথাসময় অর্থাৎ আগামী ১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হবে। একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে মেলা। তবে করোনারোধে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় মেলার স্টল সংখ্যা গতবারের তুলনায় কমতে পারে। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রবেশাধিকার দেওয়া যায় তারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু কোনও কারণে নভেম্বর-ডিসেম্বরে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে মেলার বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যথাসময়ে মেলার আয়োজন করতে কোনও বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছেন একাডেমির কর্তারা।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী  বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা বলতে পারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ যথাসময়েই হবে। ১ ফেব্রুয়ারি মেলার উদ্বোধন হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এবারের মেলা হবে। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে করোনা পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তখন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থপতি কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আরও বলেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি তা অব্যাহত থাকলে আগামী বইমেলা আয়োজন করতে কোনও বাধা নেই। সেই অনুযায়ী আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলার আয়োজন করা হবে আগামী এক মাসের মধ্যে এ নিয়ে বৈঠক করে বিস্তারিত জানানো হবে।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলরা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে বসে মেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলা একাডেমিকে। কারণ এখন বাংলা একাডেমি বললো বইমেলা হবে। সেই অনুযায়ী আমরা অর্থলগ্নি করে মেলায় বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু পরে সরকারের অনুমতি না পেয়ে বাংলা একাডেমি যদি বলে মেলা হবে না, তাহলে প্রকাশকদের যে ক্ষতি হবে তা অপূরণীয়। তাই মেলা হবে নাকি হবে না একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাঝামাঝি থাকার কোনও সুযোগ নেই। তবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। শপিং মল, সিনেমা হল খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বইমেলার আয়োজন করতে কোনও বাধা থাকতে পারে না।

অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম  বলেন, করোনা পরিস্থিতি তো এখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে। মানুষ স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আছে। বড় বড় শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সিনেমা হলও খুলে দেওয়া হয়েছে। কাজেই মেলা না হওয়ার কোনও কারণ দেখি না।

আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি  বলেন, বাংলা একাডেমি মেলার আয়োজনের কাজ শুরু করেছে এটা ঠিক। কিন্তু তারা যে কথাটা বলছে যে সরকার যদি কোনও সময় বন্ধ করে দেয় তাহলে এটাতে আমাদের কোনও আপত্তি করা যাবে না। এটা একটা নেগেটিভ বিষয়। এটাতে আমার অবজারভেশন হচ্ছে বাংলা একাডেমি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ব অনুমতি না নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বলা যেতে পারে যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কোনও অনুমতি না নিয়ে কাজটা শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, তাই বন্ধ করে দিলে আপত্তি করা যাবে না এই ধরনের কথা বলতে হচ্ছে তাদের। এখানে নেগেটিভ বিষয় হচ্ছে, মেলার আয়োজনের কাজ শুরু আগেই যার যার অনুমতি দরকার তা নিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, যখন একটা বইমেলা হয় তখন আমাদেরও একটা প্রস্তুতির বিষয় থাকে। এখন আমরা মেলার প্রস্তুতি নিলাম, তখন যদি মেলা না হয় তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

বাংলা একাডেমির সূত্র জানায়, এবারের করোনার স্বাস্থ্যবিধির কারণে মেলার স্টলের সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু কত কমবে এই মুহূর্তে বলা কঠিন। কারণ গতবার মেলায় যারা অংশ নিয়েছে তাদের প্রত্যেকেই আগামী মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী। ফলে কোনও প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া খুব সহজ বিষয় না। তাই নভেম্বর মাসে মেলার স্টলের ডিজাইন করার আগ পর্যন্ত আগামী মেলায় কতটি স্টল করা হবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন।

জানতে চাইলে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০’-এর পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ  বলেন, আগামী বইমেলায় স্টলের সংখ্যা কমলেও খুব একটা কমবে না। আরও মাসখানেক পরে যখন স্টলের ডিজাইন করতে যাবো এবং তখন যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় তখন হয়তো কিছু কমতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে তাকে স্টলের সংখ্যা কমার সম্ভাবনা খুবই কম।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০০ বই করার কথা রয়েছে বাংলা একাডেমির। এখন পর্যন্ত সংস্থাটি ২৭টি বই প্রকাশ করছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ড. জালাল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একশ বই করার কথা রয়েছে বাংলা একাডেমির। এরমধ্যে ২৭টি বই বেরিয়েছে। ৩ বছরে ১ শত বই করার কথা রয়েছে। সেইভাবে আমরা আগাচ্ছি। এবারের (আগামী) বইমেলায়ও বঙ্গবন্ধুর ওপর ২০ থেকে ২৫টি বই প্রকাশিত হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমির তথ্য মতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০ এ মেলায় ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল ৪ হাজার ৯১৯টি। বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছিল ৪১টি নতুন বই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি অংশে সব মিলিয়ে ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট বা স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।