সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এখন একজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল রয়েছেন। বাকি দুই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করেছেন। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই পদ দুটিতে সরকার কাদের নিয়োগ দেবে, এ নিয়ে রয়েছে আইনজীবীদের মাঝে কৌতূহল কাজ করছে।

রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যে দুজন সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতি এরই মধ্যে তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। এখন রাষ্ট্রপতি বিদেশে রয়েছেন। তিনি দেশে ফেরার পর হয়তো এই পদে নিয়োগ দেয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন উঠছে।

আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দুই শূন্যপদে নিয়োগ দিতে যাচ্ছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদে নিয়োগ পেতে অনেকেই চেষ্টা করছেন। সরকারও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনিসুল হকবলেন, ‘রাষ্ট্রপতি দেশের বাইরে রয়েছেন। উনি দেশে আসলে (রাষ্ট্রপতি মঙ্গলবার দেশে ফিরেছেন) নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হতে পারে।’

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো- ব্যক্তির আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সততা এবং আইন পেশায় যোগ্যতা ও দক্ষতা।

ইতোমধ্যে নিয়োগের তালিকায় এক ডজন আইনজীবীর নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন-সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক, আজহার উল্লাহ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ ও অ্যাডভোকেট শেখ আওসাফুর রহমান বুলু। এছাড়া সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সরদার আবুল হোসেন, মোজাম্মেল হোসেন, ওয়ালিউল ইসলাম ও মুনসুরুল হক চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।

তবে, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথের নাম আলোচনার শীর্ষে রয়েছে।

দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োজিত থাকার পর সম্প্রতি দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন মো. মুরাদ রেজা ও মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির।

তবে একজন গ্রহণযোগ্য আইনজীবীকে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর তাদের পদত্যাগ মোটেও সুখবর নয় বলে মূল্যায়ন করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব আলমের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান এ এম আমিন উদ্দিন।

তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর দুইজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করায় তার কার্যালয়ে এখন শুধু একজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল রয়েছেন-আইনজীবী এম এম মুনীর। এছাড়া ৬৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৫৩ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিলিয়ে মোট ২২৩ জন আইন কর্মকর্তা রয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে।

সুপ্রিম কোর্টে কাজ করে যাওয়া সিনিয়র আইনজীবীদের থেকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হবে? নাকি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলদের মধ্য থেকে দুইজনকে নিয়োগ দেয়া হবে, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে গুঞ্জন চলছে।।

সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সূত্র জানায়, প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি নিয়োগ পেয়ে মোট ১১ বছর ৮ মাস ১৪ দিন দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে মাহবুবে আলম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন বেশ কয়েকবার। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃবৃন্দের কাছে মাহবুবে আলম ছিলেন খুবই বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তাই তার যোগ্যতা ও দক্ষতার সামনে জীবদ্দশায় অন্য কোনো বিকল্প খোঁজার প্রয়োজন মনে করেনি সরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের একাধিক আইন কর্মকর্তা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যুর পর নতুন করে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব দেয় সরকার। তাই অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন সদ্য পদত্যাগকারী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির। কিন্তু তাদের কাউকে নিয়োগ না দেয়াই তারা ক্ষোভ থেকে পদত্যাগ করেছেন। যদিও তাদের পদত্যাগ করার কারণ ‘ব্যক্তিগত’ বলে গণমাধ্যমকে বলা হয়েছে।

এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম মুনীরকে গত ১ সেপ্টেম্বর নতুন করে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে গত ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিনকে বাংলাদেশের ১৬তম অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।

জানা গেছে, অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ পাওয়ার পর অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদ থেকে পদত্যাগ করার নজির নতুন না। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রয়াত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলামকে ২০০১ সালে যখন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তখন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব থেকে আইনজীবী আব্দুল ওয়াদূদ পদত্যাগ করেছিলেন।

কারা হচ্ছেন নতুন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল

প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জুনিয়র হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক। আইনজীবী হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য তিনি।

শাহ মঞ্জুরুল হক গত বছর আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি নিয়োগ পেতে পারেন বলে কয়েকজন আইনজীবী এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

অপর আইনজীবী শেখ আওসাফুর রহমান বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে আওয়ামী লীগের রাজনীতির পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলাও হয়েছিল। আইনজীবী হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে।

বাগেরহাটের আওয়ামী পরিবারের সন্তান শেখ আওসাফুর রহমান বর্তমানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগের তালিকায় তার নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

মাহবুবে আলম অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগের তালিকায় বারবার অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজুর নাম উঠে এসেছে। সম্প্রতি দুই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগের পর আবার নতুন করে আলোচনায় আসছে তার নাম।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসা দুজন আইন কর্মকর্তা বলেন, মোতাহার হোসেন সাজু দীর্ঘদিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসনিক কাজ দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন। আইনজীবী মহলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

আওয়ামী পরিবারের সন্তান মোতাহার হোসেন সাজু দীর্ঘদিন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সবদিক বিবেচনায় দুই পদের একটিতে মোতাহার হোসেন সাজু অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগের তালিকায় অ্যাডভোকেট আজাহার উল্লাহ ভূঁইয়ার নামও শোনা যাচ্ছে। নোয়াখালীর আওয়ামী পরিবারের সন্তান আজাহার উল্লাহ ভূঁইয়া ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পূক্ত। ২০১৬-১৭ সেশনে সুপ্রিম কোর্ট বারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদেরও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। আইন পেশায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আজাহার উল্লাহ ভূঁইয়া নিয়োগ পেতে পারেন বলে একাধিক প্রভাবশালী আইনজীবী নেতা মনে করছেন।

ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি দেশের সংবিধান প্রণেতাদের সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের জুনিয়র হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মধ্যবয়সী আইনজীবীদের মধ্যে তার সংবিধান ও কোম্পানি আইনে বিশেষ পারদর্শিতা সবার জানা। সরকারের শীর্ষ মহলে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ দীর্ঘসময় ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। গুরুত্বপূর্ণ সব মামলার নথিপত্র তার নখদর্পণে। তাই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তাকে পদোন্নতি দেয়া হতে পারে বলেও আইনজীবীদের বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।