স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের কাছ থেকে ৬৯টি শস্য গুদামের মালিকানা পেয়েছে কৃষি বিপণন অধিদফতর।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম।

মজুদ করতে না পারায় কৃষককে কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে হয় জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৮ সালে চিন্তা করেছিলাম, কৃষককে ধান যাতে বিক্রি করতে না হয়, কিছুদিন ধান যেন রাখতে পারে। তার সংসার চলবে কী করে, সেজন্য ৮০ ভাগ ঋণ দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ধানের দাম যখন বাড়বে তখন যাতে বিক্রি করে বেশি মূল্য পায়। এই প্রকল্পটি অনেক আগেই বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। দুঃখজনকভাবে সেটি হয়নি।’

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘শুধু ৬৯টি নয়, সারাদেশেই আমাদের খাদ্য গুদাম করতে হবে। আমরা দাবি করছি আমরা কৃষিবান্ধব, সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের গুদাম হস্তান্তরের উদ্যোগকে অত্যন্ত মহৎ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সবাই সাম্রাজ্য বাড়াতে চায়। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ খুব সহজেই ৬৯টি গুদাম হস্তান্তর করছে এবং কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার জন্য জমি দিচ্ছে। আমি তাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি। এটা দিয়ে আমাদের শুরু। আমরা এই প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারিত করব।’

Goods-2

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এক সময় খাদ্য ঘাটতির দেশ ছিল। এখন আর আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হয় না। শুধু দানাদার খাদ্য নয়, মৎস্য, পশু উৎপাদনসহ নানাবিধ ফসলের অর্জন দেখে সারাবিশ্ব আজ আমাদের দেখে হিংসা করে।’

‘এরকম একটি সময়ে কৃষিকে আধুনিকায়ন করা এবং আরও বেশি গুণগত পরিবর্তন আনাসহ উপজেলা পর্যায়ে কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগ নেয়ার জন্য আমি কৃষিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর কৃষকদের বহুবিদ জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এতে করে কৃষকরা আরও বেশি আধুনিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে। ফলে কৃষিতে আরও বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তাই আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটাই সঠিক সময় ৬৯টি শস্যগুদাম হস্তান্তরের’—বলেন তাজুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, রংপুর, শেরপুর, মাগুরা ও বরিশাল অঞ্চলে ২৭টি জেলায় ৫৬টি উপজেলায় ৮১টি গুদাম পরিচালিত হচ্ছে। ৮১টি গুদামের মধ্যে ১২টি গুদাম কৃষি বিপণন অধিদফতরের নিজস্ব এবং অবশিষ্ট ৬৯টি গুদাম স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের কাছ থেকে বার্ষিক ভাড়ার ভিত্তিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি গুদামের গড় ধারণ ক্ষমতা ২৫০ মেট্রিক টন। বছরে গড়ে চার হাজার ৩৬৫ জন কৃষক পরিবারকে চার হাজার ৯২১ মেট্রিক টন শস্য জমার বিপরীতে ৬০৪ লাখ ৯১ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়ে থাকে।

কৃষি বিপণন অধিদফতর এলজিইডির ৬৯টি খাদ্য গুদামের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৬৯টি খাদ্য গুদাম কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদফতরকে হস্তান্তরে সম্মতি দেয়। কৃষি বিপণন অধিদফতর শস্যগুদাম ঋণ কার্যক্রমের আওতায় এ কার্যক্রম চালায়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মূল্য সহায়তা তথা আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় দাতা সংস্থার সরাসরি অর্থায়নে ‘শস্যগুদাম ঋণ কার্যক্রম’ শুরু হয়। মডেলটি সফল হওয়ায় ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত তা সম্প্রসারণ করা হয় বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের জুলাই থেকে ২০০৪ সালের জুন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরকারের অর্থায়নে এটি ‘শস্যগুদাম ঋণ প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির কার্যক্রম ২০০৪ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত কর্মসূচি আকারে এবং ২০১০ সালের জনবলসহ কর্মসূচিটি কৃষি বিপণন অধিদফতরের রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর থেকে কার্যক্রমটি কৃষি বিপণন অধিদফতরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে।

এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ভূমিহীন, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মাঝারি কৃষক ভরা মৌসুমে তাদের উৎপাদিত শস্য ৮১টি গুদামে (এলজিইডির মালিকানাধীন ৬৯টি ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের ১২টি) রাখে এবং গুদামে সংরক্ষিত শস্যের বিপরীতে ব্যাংক থেকে স্বল্প সময়ের জন্য ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করে। পরে খাদ্যশস্যের দাম বাড়লে তা বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করে। বিআইডিএসসহ অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শস্য গুদাম ঋণ কার্যক্রমটি একটি জনপ্রিয় ও সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে।

একনেক সভায় শস্যগুদাম ঋণ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত গুদামগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিতে গুদামের প্রয়োজনীয় সংস্কার, মেরামতসহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘শস্য গুদাম ঋণ কার্যক্রম আধুনিকীকরণ, ডিজিটালাইজেশন ও সম্প্রসারণ’ শিরোনামে ১৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়।

কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ
দেশের আটটি বিভাগের ৪৭টি জেলার ১০৬টি উপজেলায় কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপজেলা পর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের অধীনে ২০২২ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহার করতেও কৃষি মন্ত্রণায় ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।