স্পোর্টস ডেস্ক :নিজে ছোট্ট একটা বিষয়কে নিয়েছিলেন খুবই হালকাভাবে। ভেবেছিলেন, ‘এ আর এমন কি! চুপচাপ থাকলেই তো হয়ে যায়। আমি নিজে তো আর কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়াচ্ছি না।’

সাকিব আল হাসানের এমন ভাবনাটাই তার জন্য শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়টাকে হালকাভাবে নিয়ে তা জানাননি কাউকেই। আইসিসিকে তো নয়, এমনকি বিসিবিকেও না। যে কারণে বিষয়টাকে আইসিসি নিয়েছে খুবই সিরিয়াসলি।

শেষ পর্যন্ত বড়সড় নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে পারলেও এক বছরের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন সাকিব। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল ২ বছরের জন্য। কিন্তু তদন্ত কাজে সহযোগিতার কারণে শুরুতেই এক বছরের নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করে দেয় আইসিসি।

সেই নিষেধাজ্ঞা থেকে সাকিব মুক্ত হয়েছেন ২৯ অক্টোবর। এখন তিনি মুক্ত-স্বাধীন। যে কোনো সময় নামতে পারবেন খেলার মাঠে। সে লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার রাতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকা ফিরে এসেছেন সাকিব আল হাসান। আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। সাকিবের সেই টুর্নামেন্ট দিয়েই মাঠে ফেরার কথা রয়েছে।

তার আগে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সাকিব। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘কেউ যেন (কোনো ক্রিকেটার) কোনো বিষয়কেই হালকা করে না দেখে। বিশেষ করে ক্রিকেট দুর্নীতির বিষয়গুলো। ফিক্সিংয়ের কোনো প্রস্তাব কিংবা কোনো গন্ধ পেলেও যেন সেটা দ্রুত সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে দেয়া হয়।’

গত বছর আইসিসি যখন সাকিবের শাস্তির কথা ঘোষণা করে, তখন একই সঙ্গে তার সঙ্গে ভারতীয় জুয়াড়ি দীপক হুদার যে যোগাযোগ হয়েছিল, সে প্রমাণও প্রকাশ্যে উপস্থাপন করে তারা। ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে যে দীপক হুদার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে সাকিবের সঙ্গে কথা-বার্তা হতো, সে প্রমাণও উপস্থাপন করে আইসিসি।

ইউটিউব চ্যানেলে সাকিব বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার শাস্তি পাওয়ার পর আমি অনুশোচনায় ভুগেছি। অনুতপ্ত হয়েছি। কোনোভাবেই আমার এমন ভুল করা উচিৎ হয়নি। আমি মনে করি, এখান থেকে বড় একটা শিক্ষা পেয়েছি। সবার কাছেই অনুরোধ জানাবো, আপনারা এ ধরনের ভুল কখনো করবেন না। যখনই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, তখনই আপনি আইসিসি কোড অব কন্ডাক্টের অধীনে নিজের দায়িত্বে চলে যাবে বিষয়টাকে কিভাবে সামলাবেন। বিষয়টাকে হালকাভাবে না নিয়ে, দ্রুত সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে দেয়াই হবে উত্তম।’

কি করতে হবে এই ধরনের পরিস্থিতিতে, সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন সাকিব। তিনি বলেন, ‘আপনার উচিৎ হবে, অবশ্যই বিষয়টাকে একজন অ্যান্টি করাপশন অফিসারকে জানানো। সেই অফিসার স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক- যেই হোন। আমরা সবাই এই প্রসিডিউর সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানি। তাদেরকে বিষয়টা না জানিয়ে কোনো ভুল কেউ কখনো করবেন না। এ বিষয়টাকে কেউ হালকাভাবেও নেবেন না। যখনই আপনি কারো দ্বারা প্রভাবান্বিত হওয়ার মত অবস্থায় যাবেন, তখনই সেটা কাউকে না কাউকে জানিয়ে দেবেন।’

 

গত বিশ্বকাপ চলাকালেই তার এ বিষয়টা নিয়ে আইসিসির তদন্ত চলমান ছিল। সাকিব জানালেন, এ ধরনের তদন্তের বিষয়টা মাথায় নিয়ে বিশ্বকাপে খেলাটা ছিল মানসিকভাবে অনেক বড় একটি কষ্টের কাজ। যদিও বিষয়টা কেউ জানতো না। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ৬ মাস আগে থেকেই সাকিব আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের কর্মকর্তাদের অধীনে ছিলেন। তারা নিয়মিত সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতো এবং তিনিও তদন্ত কাজে আইসিসিকে যথাসম্ভব সব ধরনের সহযোগিতা করে গেছেন।

সাকিব বলেন, ‘এটা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ।’ পরক্ষণেই তিনি যোগ করেন, ‘লম্বা সময় ধরে তদন্ত কাজ চলছিল। যে কারণে তারা নিয়মিতই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। ওটা ছিল আমার জন্য সত্যিই একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। এটা কখনোই একজন ক্রিকেটাররে জন্য ভালো কিছু হতে পারে না। এমনকি এসব কারণে ঠিকমত ঘুমও হয় না।’

নিষেধাজ্ঞার কবলে যে পড়তে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে জানতেন সাকিব আল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। যদিও আমি ভাবতাম, কিছুই হবে না। আমি আসলে নিশ্চিত ছিলাম না, কি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে আমাকে। যখন বিষয়টা সম্পর্কে আমি জানছি, তখন আপনারাও বিষয়টা সম্পর্কে জেনে গেছেন। কিন্তু তদন্তকালীন সময়টা আমার জন্য মোটেও সহজ কিছু ছিল না।’

এতকিছুর পরও বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন সাকিব। ব্যাট এবং বল হাতে সমান পারফরম্যান্স দেখান তিনি। ৮৬.৫৭ গড়ে ৬০৪ রান করার পাশাপাশি ১১ উইকেটও সংগ্রহ করেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অলরাউন্ডার ৬০০ প্লাস রান এবং ১০ প্লাস উইকেট শিকার করেন।

সাকিব জানিয়ে দেন, আইসিসির তদন্তের কোনো প্রভাবই তার পারফরম্যান্সে পড়েনি। তিনি বলেন, ‘এটা আমার বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সে মোটেও কোনো প্রভাব ফেলেনি। আমি হয়তো বিশ্বকাপের আগেও নিষিদ্ধ হতে পারতাম। কারণ, তদন্ত তো শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে। আমি কখনোই ভাবিনি যে, তদন্ত চলার পরও বিশ্বকাপে এতটা ভালো খেলতে পারবো।’

তাহলে কিভাবে বিশ্বকাপে এতটা ভালো করেছিলেন সাকিব? তিনি বলেন, ‘আমি মানসিকভাবেই চেয়েছিলাম, এই বিশ্বকাপে ভালো করতে হবে আমাকে। কারণ, আগের বিশ্বকাপে আমি খুব বাজেভাবে কাটিয়েছিলাম। আগেরবার আমি নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারিনি। আমি চিন্তা করেছিলাম, এটা ছিল আমার জন্য খুবই সঠিক একটি সময় এবং সঠিক একটি বয়স। আর ওটা (তিন নম্বরে ব্যাটিং করা) ছিল আমার জন্য খুবই ভালো একটি পজিশন। এ কারণেই আমি চেষ্টা করেছিলাম, সর্বোচ্চটা ঢেলে দিতে।’

সাকিব জানিয়ে দিয়েছেন, এক বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং একই সঙ্গে করোনা মহামারি, তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘যখন আমি সংবাদটা (নিষেধাজ্ঞার) শুনলাম, তখন এটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় একটি ধাক্কা। আমি খুবই ভেঙে পড়েছিলাম এবং দুঃখ পেয়েছিলাম। তবে একই সময় আমি চিন্তা করলাম, ওকে জীবন হয়তো আমাকে একটা বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। আমি নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য এক বছর সময় পেলাম এবং যখন ফিরে আসবো, তখন আমাকে আবারও প্রমাণ করতে হবে। যখন নিষিদ্ধ হলাম, তখন এই বুঝ দিয়েই নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করলাম।’

করোনা কিভাবে তার মধ্যে ভিন্ন চিন্তার উদয় ঘটিয়েছে? এ বিষয়ে সাকিব বলেন, ‘করোনা এবং আমার নিষেধাজ্ঞা, আমাকে নিজের জীবন সম্পর্কে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সুযোগ করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সংগ্রামই কেবল এসব পরিস্থিতি থেকে একজন মানুষকে উত্তরণ ঘটাতে সাহায্য করে। যখন কোনো মানুষ এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসে, তখন তারা বিষয়টাকে খুব শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে পারে। আমি এখন খুব ভিন্নভাবে কিছু চিন্তা-ভাবনা করছি। যা আমাকে আমার জীবন গঠনে সহায়তা করছে।’

সাকিব নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর সতীর্থরা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। মাহমুদউল্লাহ, মুমিনুল, মুশফিকসহ প্রায় সবাই। বিষয়টা কেমন অনুভূতি জাগাচ্ছে? সাকিব বলেন, ‘সবার অনুভূতি জানা খুব সহজ বিষয় নয়। তারা হয়তো আমাকে সন্দেহ করতে পারে, কিংবা বিশ্বাসও না করতে পারে। আমি এসব বিষয়কে একেবারে বাদ দিচ্ছি না। তবে আমি সবার সঙ্গেই সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। এ কারণে হয়তো অন্যদের মতো আমার অনুভূতিটা একই রকম নাও হতে পারে। আমি আশা করবো, কারো সঙ্গে এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না এবং তারা আমাকে আগে যেমন বিশ্বাস করতো এখনও সেভাবে করবে। যদিও আমার প্রতি একটু সন্দেহ থাকা অসম্ভব কিছু নয়। এটা নিয়ে আমি খুব বেশি হতাশও হবো না।’