দেশে লাইসেন্সধারী কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০টি হলেও এর মধ্যে ৮০ শতাংশের লাইসেন্সের মেয়াদ পার হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ২ বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীসহ সারাদেশে অসংখ্য কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে লাইসেন্স ছাড়াই। এ সংখ্যা ৫ শতাধিক হবে বলে জানা গেছে। এছাড়া ফেসবুকভিত্তিক কুরিয়ারের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। কিন্তু এগুলোর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। ইচ্ছামতো ব্যবসা করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাপারটি নজরে এসেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের। বিভাগের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের আওতাধীন মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটি রীতিমতো গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কুরিয়ার ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া কুরিয়ার ব্যবসা করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সধারীদের লাইসেন্স নবায়ন করতে বলা হয়েছে, অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে তাদের। এদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীও হুঁশিয়ার  করেছেন, লাইসেন্স ছাড়া কোনও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না। কেউ পরিচালনা করতে পারে না।

জানা গেছে, কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতি নজরদারি না থাকায় ইচ্ছামতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। স্বচ্ছতা না থাকায় বিভিন্ন ধরনের অবৈধ মালামাল বহনও করছে—এমন অভিযোগ রয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর বিরুদ্ধে। সরকার কুরিয়ার সার্ভিসকে কঠোর মনিটরের আওতায় নিয়ে আসতে চায়। সরকার মনে করে, এ জন্য প্রয়োজন কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটালাইজেশন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারবে। এছাড়া যারা লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে ব্যবসা করছে তাদের ধরাও সহজ হবে। ফেসবুকে কোম্পানির প্রচার ও এজেন্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশও বন্ধ হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের অধীন মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলেছে, মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস বিধিমালা-২০১৩ জারি করা হয়েছে। ওই বিধিমালার ১১(১) বিধি অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠানের মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান থেকে লাইসেন্স গ্রহণ না করেই কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এমনকি লাইসেন্সবিহীন কিছু প্রতিষ্ঠান পত্র-পত্রিকায় ও অনলাইনে কুরিয়ার ব্যবসার বিজ্ঞপ্তি ও এজেন্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি নিয়ম-নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও বেআইনি। সরকারি নিয়ম-নীতি বহির্ভূত অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে সংস্থাটি। জনসাধারণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এতে আরও বলা হয়, এছাড়া লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ, মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান থেকে লাইসেন্স গ্রহণ না করে অথবা হালনাগাদ লাইসেন্স নেই এমন কোনও প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নিয়োগ না হওয়ার জন্য এবং ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডাক দ্রব্যাদি না পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘লাইসেন্স ছাড়া কোনও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না। কেউ পরিচালনা করতে পারে না। আমাদের ভাবখানা এমন, আমরা লাইসেন্স দিয়েই খুশি। লাইসেন্স দিলেই হলো? কেউ ফলোআপ করে না। কুরিয়ার বিষয়ে বেশি ঢিলাঢালা হয়ে যাওয়ায় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো যা ইচ্ছা তাই করছে। যেভাবে খুশি পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনও জবাবদিহি নেই। এটা আর থাকবে না।’

তিনি জানান, শুধু লাইসেন্স দেওয়াই নয়, কুরিয়ার সেবার পুরো প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটালাইজড করা হবে। ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হবে। প্যাকেটটা কোথায় আছে, ডেলিভারি কবে হবে, কোথায় হয়েছে, হারিয়ে গেলে সর্বশেষ লোকেশন কোথায় ছিল তাও ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, ‘কুরিয়ারের লাইসেন্সিং গাইডলাইনে যেভাবে উল্লেখ আছে ব্যবসা সেভাবেই পরিচালনা করতে হবে।’ অসংখ্য কুরিয়ার কোম্পানি গড়ে উঠছে, ফেসবুকভিত্তিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানও আছে, যাদের লাইসেন্স নেই এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সবাইকে লাইসেন্স নিয়ে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে বলা হচ্ছে। নিয়ম না মানলে এখন থেকে ধরা হবে।’

তিনি ‍উল্লেখ করেন, ‘এনি কাইন্ড অব ডেলিভারি (যেকোনও ধরনের পণ্য ও সেবা ডেলিভারি) লাইসেন্সের আওতায় আসবে।’

জানা যায়, দেশে লাইসেন্সধারী কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭০টি। অভিযোগ রয়েছে এর মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, গত ২ বছরেও নবায়ন করা হয়নি। এছাড়া অলিগলি মিলিয়ে দেশে কুরিয়ারের সংখ্যা ৫ শতাধিক। বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নেই। অন্যদিকে ফেসবুকভিত্তিক কুরিয়ারেরও লাইসেন্স লাগবে, কিন্তু ৯৮ শতংশ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই। করোনাকালেই ভেসবুকভিত্তিক অনেক কুরিয়ারের জন্ম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ই-ক্যাব অনেক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানকে সদস্য করেছে কোনও ধরনের কুরিয়ার লাইসেন্সের এনওসি ছাড়া। এ সংখ্যা ২০টির বেশি হবে বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘অনেক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান ই-ক্যাবের সদস্য হয়েছে তাদের সবার লাইসেন্স নেই। তারা শিগগিরই আবেদন করবে বলে আমাদের জানিয়েছে। আমরা এরইমধ্যে সবাইকে চিঠি দিয়েছি লাইসেন্স নেওয়ার জন্য।’ তিনি জানান, অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আছে যারা নিজেরা ডেলিভারি করছে, ই-কমার্সভিত্তিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান দিয়ে করাচ্ছে। সবাইকে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘ই-কমার্স ও কুরিয়ারে বিশেষ করে ডেলিভারিতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। এসব সমস্যা দূর করতে আমরা ডেলিভারিম্যানদের জন্য বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) সলিউশন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি। ই-ক্যাব থেকে সরকারকে এই বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ডেলিভারিম্যানদের বায়োমেট্রিক সলিউশনের আওতায় আনা গেলে তাদের ট্র্যাক করতে সুবিধা হবে। আর ট্র্যাক করা গেলেই অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে।’

নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি কমপ্লায়েন্স একটি কোম্পানি। এ জন্য আমাদের অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। কিন্তু লাইসেন্স ছাড়াই অনেক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে কোনও ধরনের বাধা ছাড়াই সেবা দিচ্ছে। তাহলে কুরিয়ারের লাইসেন্স নিয়ে আমাদের কী লাভ হলো।’ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স পাওয়া অনেক কঠিন একটি কাজ। এই কাজটিই অনেকে করে না। তারা সার্ভিস ঠিকমতো না দিয়ে বাজারে বদনাম তৈরি করে, তার খেসারত আমাদেরও দিতে হয়। সরকারের কুরিয়ার সার্ভিস ডিজিটালাইজড ও লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা করা গেলে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে।’