মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং (টিটি) কলেজের বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন) কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন না সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও ভর্তি হতে পারবেন না এই কোর্সে। এতে বেসরকারি টিটি কলেজগুলো পাচ্ছে না প্রশিক্ষণার্থী। ফলে সংকটে পড়তে চলেছে দেশের সব বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর গত ২৭ নভেম্বর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য তালিকা তৈরি করে সরকারি ট্রেনিং কলেজে ভর্তির জন্য প্রেষণ মঞ্জুর করেছে। ডেপুটেশন বা প্রেষণ ছাড়া সরকারি শিক্ষকরা বিএড বা এমএড কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন না। এর আগে প্রেষণ ছাড়াও সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং এমপিওভুক্ত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেসরকারি টিটি কলেজে বিএড/এমএড কোর্স করতেন।

২২ নভেম্বর প্রকাশিত প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তি সংক্রান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রেষণ বা ডেপুটেশন ছাড়া অন্য প্রশিক্ষণার্থীদের ভর্তির জন্য স্নাতক পরীক্ষায় আগের নিয়মে ৪৫ শতাংশ নম্বর এবং গ্রেডিং পদ্ধতিতে সিজিপিএ ২.২৫ থাকতে হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে তিন বছর মেয়াদী স্নাতক পাস অথবা ৪ (চার) বছরের স্নাতক (সম্মান) পাস হতে হবে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইগ্রেশন সনদ লাগবে।

গত ২৫ বছর ধরে বেসরকারি টিটি কলেজগুলো মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বিএড প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভর্তির সুযোগ উন্মুক্ত ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও যেকোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২ বছরের বা ৩ বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পেতেন। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণদের মূল মাইগ্রেশন প্রয়োজন হতো না।

এই পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের দফতরে লিখিত আবেদন জানিয়েছে বেসরকারি টিচার ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতি।

বেসরকারি টিটি কলেজগুলো বলছে— করোনার সময় নন-এমপিও শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তের কারণে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পারছেন না। তাছাড়া করোনার সময় মাইগ্রেশন সনদ সংগ্রহ করাও সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলো প্রশিক্ষণার্থী পাচ্ছে না।

বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘২৫ বছরের নিয়ম ভেঙে করোনার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমাদের কলেজগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারত। সরকারি ও বেসরকারি টিটি কলেজ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এক ও অভিন্ন কারিকুলাম, সিলেবাস, পরীক্ষাসহ একই একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়। সব নিয়ম এক হলেও ভর্তির নিয়ম ভিন্নতা কেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘ভর্তির শর্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষদের স্নাতকে তৃতীয় বিভাগ থাকার জন্য তারাও এ বছর বিএড কোর্সে ভর্তি হতে পারবে না। কোভিড ১৯ -এর কারণে এমনিতেই কলেজগুলো নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির নীতিমালা পরিবর্তন হওয়ার কারণে বেসরকারি টিটি কলেজগুলো ভর্তি বিড়ম্বনায় পড়ে। দিন দিন শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়ছে এবং কলেজগুলো চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়ছে, যা মোটেও কাম্য হতে পারে না।’

বেসরকারি টিচার ট্রেনিং কলেজগুলোর দাবি— বিএড ভর্তি সংক্রান্ত নীতিমালা সরকারি ও বেসরকারি টিটি কলেজের জন্য এক ও অভিন্ন করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলজগুলোয় একই ভর্তির নীতিমালা জারি করেই ২০২১ সালের ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় বিষয়টি সুরাহার জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন বেসরকারি টিচার ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের সরকারি টিটি কলেজে ভর্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বলিনি বেসরকারি টিটি কলেজে অন্যরা ভর্তি হতে পারবে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তের কারণে যদি সমস্যা হয়, সেটা তারা দেখবে। কারণ বেসরকারি টিটি কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এফিলিয়েটেড।’

উল্লেখ্য, সারাদেশে সরকারি টিটি কলেজ ১৪টি। আর বেসরকারি টিটি কলেজ ৭৫টি। দেশের ৭৫ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে বেসরকারি টিটি কলেজগুলো। বর্তমানে দুই লাখের বেশি প্রশিক্ষণবিহীন মাধ্যমিক শিক্ষক আছে। সরকারি টিটি কলেজের ৬ হাজারের কিছু বেশি আসনের বিপরীতে এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে লাগবে প্রায় ৩০ বছর!