দেশে অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) রোধে সরকার ৮৮১টি প্রতিষ্ঠানকে ভিএসপি (ভিওআইপি সার্ভিস প্রোভাইডার) লাইসেন্স দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, অপারেটরগুলো দেশের বাইরে থেকে বৈধ পথে ইনকামিং কল নিয়ে আসবে। এজন্য বিভিন্ন দেশে রোড শো, সেমিনার ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাবে। সেসবের কিছুই হয়নি। অবৈধ পথে কল আসাও বন্ধ হয়নি। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের জুড়ে দেওয়া হয়েছিল আইজিডাব্লিউয়ের সঙ্গে। এখন তাদের অস্তিত্ব শুধু লাইসেন্সেই সীমিত।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে বিটিআরসি ৮৮১টি ভিএসপি লাইসেন্স ইস্যু করে। টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টরা তখন বলেছিলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ’শখানেক হলেই ঠিক ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ভিএসপি অপারেটরগুলোর বাঁচিয়ে রাখতে একেকটি আইজিডাব্লিউ অপারেটরের সঙ্গে একাধিক ভিএসপিকে ট্যাগ করা হয়।
দেশে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক কল কমতে থাকায় ব্যবসা হারাতে বসে আইজিডাব্লিউ অপারেটরগুলো। একটি আইজিডাব্লিউতে কর্মরত এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভিএসপি অপারেটরগুলো আগে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলে যুক্ত থাকলেও এখন ওসবের বালাই নেই। এখন মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে দেওয়া হয় অপারটেরকে। অর্থাৎ ভিএসপি অপারেটরগুলো লাইসেন্স বা সুইচ ভাড়া দিয়েই টিকে আছে।

ওই কর্মকর্তা উদাহরণ হিসেবে ‍উল্লেখ করেন, ধরা যাক একটি আইজিডাব্লিউ মাসে আয় করলো ১ লাখ টাকা। আইজিডাব্লিউ অপারেটর রাখলো ৬০ বা ৭০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট ভিএসপি অপারেটরকে ৩০ হাজার বা কিছু বেশি দিয়ে দিল। তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেখানেই এমন ঘটনা ঘটছে বলে জানান।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন প্রযুক্তির আগমণে এমনিতেই বৈধ পথে কল কমে গেছে। ফলে আইজিডাব্লিউগুলো ব্যবসা হারিয়েছে। অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ভিএসপি অপারেটররাও। বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জুলাইতে দেশে বৈদেশিক ইনকামিং কল এসেছে ৭৫ কোটি মিনিটের কিছু বেশি। সেই হিসেবে গড়ে প্রতিদিন আড়াই কোটি মিনিট। বহুসংখ্যক ভিএসপি অপারেটরের তুলনায় যা বেশ নগণ্য। আবার সব অপারেটর সমান সংখ্যক কল আনতেও পারে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার  বলেন, বিদেশে কল করা ও বিদেশ থেকে কল আসার অনেক উন্নত প্রযুক্তি এসেছে। যোগ হয়েছে ভিডিও।  টেক্সট করা যাচ্ছে ডাটা ব্যবহার করে। টাকা খরচ করে ভয়েস কলে কে পড়ে থাকতে চাইবে। ফলে ভিএসপির যা পরিণতি হওয়ার সেটাই হতে যাচ্ছে।

২০১৯ সালের ৭ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিটিআরসি জানায়, লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও নবায়ন না করায় ১২৪টি ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) লাইসেন্স (ভিএসপি) বাতিল করেছে বিটিআরসি। জানানো হয়, ১২৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৬টি প্রতিষ্ঠান সরকারের বকেয়া পাওনা পরিশোধ ও যথাসময়ে নবায়ন করেনি। ১৮টি প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে আবেদন না করায় তাদের লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ১২৪টি ভিএসপি লাইসেন্সের কোনও বৈধতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে লাইসেন্সগুলো বাতিল করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিটিআরসি। লাইসেন্স বাতিলের পর লাইসেন্স সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪৯টিতে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, তখন ধারণা করা হয়েছিল বেশি সংখ্যক লাইসেন্স দিলে অপারেটররা দেশের বাইরে থেকে বেশি কল নিয়ে আসবে, বিভিন্ন দেশে শো করবে, সেমিনার করবে। সেসবের কিছুই হয়নি।

আইজিডাব্লিউ লাইসেন্সধারী ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশন্স লিমিটেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, আইজিডাব্লিউর ব্যবসায়ই তো খারাপ, সেখানে ভিএসপিগুলো টিকবে কিভাবে? বিদেশি কলই তো নেই। প্রায় বছর দুয়েক আগে ভিএসপি অপারেটরগুলো এক প্রকার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভিএসপিগুলো তাদের সুইচ তথা লাইসেন্স আইজিডাব্লিউ অপারেটরগুলোর কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে মাসে বা বছরে একটা টাকা পায়।  বিটিআরসির বাধ্যবাধকতা না থাকলে এতদিন ভিএসপি অপারেটরগুলোর নামই থাকতো না। বিটিআরসির বাধ্যবাধকতা থাকায় আইজিডাব্লিউ অপারেটরগুলো ভিএসপিগুলোকে ধরে রেখেছে।

বিটিআরসির ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায় এখনও ভিএসপি অ্যালোকেশন নামে একটি অংশে সব ভিএসপি অপারেটরের নাম রয়েছে। তারা কোন আইজিডাব্লিউয়ের সঙ্গে ট্যাগ করা তাও উল্লেখ করা আছে। আইজিডাব্লিউ প্রতিষ্ঠান ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশন্স লিমিটেডে দেখা গেলো ভিএসপি অপারেটর ট্যাগ করা আছে ৬৭টি।