আয়করের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে লোন প্রসেসিং ও ব্যাংক লোন করে দেওয়ার নামে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন ‘বনবন্ধু’ খ্যাত প্রতারক জাহিদুর ইসলাম। জাহিদুরকে গ্রেফতারের পর তেজগাঁও থানা পুলিশের কাছে লিখিত ও মৌখিক শতাধিক অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্য আরও প্রতারণার পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাংক লোনের জন্য প্রতারক জাহিদুর তাদের কাছে থেকে তিন লাখ করে টাকা নিতো।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, প্রতারক জাহিদুরের কাছে যে ভিকটিমরা এসেছেন, তাদের অধিকাংশ ব্যক্তিকে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক লিমিটেড থেকে লোন করে দেওয়ার আশ্বাস দিতো সে। লোনের পরিমাণ যেটাই হোক না কেন, জাহিদুরের ডিমান্ড থাকতো তিন লাখ টাকা। সেই টাকা নিতে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে জানিয়ে বিশ্বাস অর্জন করতো।

মামলা সংশ্লিষ্ট সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদ খান  বলেন, প্রতারক জাহিদুর ৩০ বছর ধরে প্রতারণা করছে। এই সময়ে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। গত দুদিনে আরও তিনটা প্রতারণার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ এসেছে। আমার কাছে ফোন এসেছে ২৫টিরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবি ব্যাংক থেকে লোন করে দিতে পারবে বলে টাকা নিয়েছে সে। তবে কাউকে লোন করে দিতে পারেনি।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, জাহিদুর কাজ নিতেন প্যাকেজ হিসেবে। পেপারস রেডি করে দেওয়া। কোনও নতুন কোম্পানি খুলতে সাহায্য করা। প্রাথমিকভাবে এসব কাজ দিয়ে শুরু করলেও পরে লোন করে দেওয়ার কথা বলে আশ্বাস দিতো। প্রথমে কিছু কাজ হয়ে যাওয়ার পর মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে। তখন লোনের জন্য টাকা দিতো।

প্রতারক জাহিদুরকে নিয়ে আইসিবি ব্যাংকের মিটিং

ভুক্তভোগীরা শুধু পুলিশের কাছেই অভিযোগ করেনি। টাকা দিয়েও আইসিবি ব্যাংক থেকে লোন না পেয়ে শতাধিক ভিকটিম জাহিদুরের বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। একই লোকের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ আসায় নিজেদের মধ্যে মিটিং ডেকেছিল আইসিবি ব্যাংক। সেখানে আলোচনা হয়, কে এই প্রতারক জাহিদুর? ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার সঙ্গে তার সম্পর্ক?

সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদ খান বলেন, আমি নিজে আইসিবি ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। এই প্রতারক টাকার বিনিময়ে লোন করে দিতে পারবে বলে গ্রাহকদের কাছে টাকা নিয়েছে, বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষও জানতে পারে। পরে তারা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। তবে কোনও ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে এই প্রতারকের যোগসাজস নেই বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। তাছাড়া সে কাউকে লোনও করে দিতে পারেনি।

এর আগে, গত মঙ্গলবার নিজেকে ‘বনবন্ধু’ পরিচয় দিয়ে মুজিববর্ষের লোগো ব্যবহার করে গাছ লাগানোর কথা বলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে জাহিদুর রহমান ইকবাল নামে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে ২৭০টি সিল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৮৪টি ডকুমেন্টস প্রসেসিং ফাইল, মুজিববর্ষের লোগো ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী সম্বলিত ৫০০টি চিঠি, দুটি সিপিইউ, দুটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার, দুটি মনিটর, একটি ল্যাপটপ, দুটি মোবাইল ফোন এবং একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়।

পরদিন বুধবার তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুণ-অর-রশীদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাহিদুর রহমান ইকবাল ওরফে ‘বনবন্ধু’ জাহিদুর রহমান ইকবাল মুজিববর্ষের লোগো ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী ব্যবহার করে প্রায় ৪০ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়েছে। এর মাধ্যমে সে তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রতারক জাহিদুর ‘ট্রি প্লান্টেশনের’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পরিচয় দিতো। মুজিববর্ষে বিভিন্ন জায়গা গাছ লাগাবে বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিতো। কোম্পানিগুলোর কোনও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি সে। জাহিদুর বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ভাঙিয়ে লোন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলেও জানান উপ-কমিশনার হারুণ-অর-রশীদ।